একটি পশুর রক্ত কি আপনার জাহান্নামের আগুন নেভাতে পারে?
জবেহিল আজিম:
নিচের লেখাটি পড়ার আগে এখানে আপনার মতামত দিন
আমরা প্রতি বছর জিলহজ মাসে পরম ভক্তিভরে কোরবানি দিই। পশুর রক্তে ভেসে যায় আমাদের আঙিনা। কিন্তু আপনি কি কখনো নিজেকে এই একটি ভয়ংকর সৎ প্রশ্ন করেছেন, "আল্লাহর কি পশুর রক্তের অভাব পড়েছে? আপনার করা গুনাহর কারণে আল্লাহ কেন একটি অবলা পশুকে মারার হুকুম দেবেন?"
পবিত্র কোরআনের সূরা আল-হাজ্জ ২২:৩৭ আয়াতে আল্লাহ পরিষ্কার বলে দিয়েছেন: "আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না সেগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।"
তাহলে প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়ে ওঠে: যদি পশুর রক্ত আল্লাহর কাছে না-ই পৌঁছায়, তবে কেন এই কুরবানির বিধান? কেন আদি পিতা আদম (আ.) থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত এই রক্তপাতের সিলসিলা চলে আসছে? আপনি কি মনে করেন একটি গরু বা খাসির রক্ত আপনার সারা জীবনের করা জেনা, মিথ্যা, গিবত বা হকের খেয়ানতের মতো ভয়ংকর গুনাহর 'কাফফারা' বা মূল্য হতে পারে?
কখনো কি ভেবে দেখেছেন, হযরত ইব্রাহিম (আ.) যখন তাঁর কলিজার টুকরো ইসমাইল (আ.)-কে কুরবানি করতে উদ্যত হলেন, আল্লাহ কেন শেষ মুহূর্তে একটি জান্নাতি পশু পাঠিয়ে ইসমাইলকে বাঁচালেন? সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১০৭ আয়াতে আল্লাহ এই ঘটনাকে বর্ণনা করেছেন এক অদ্ভুত ভাষায়: "ওয়া ফাদাইনাহু বি জিবহিন আজিম"—অর্থাৎ, "আমি তাকে মুক্ত করলাম এক মহান কুরবানির বিনিময়ে।"
ইসলামের মহান ইমাম ও তফসিরকারকরা স্বীকার করেছেন যে, কুরবানি মানে হলো নিজের গুনাহর বদলে অন্য একজনের প্রাণ উৎসর্গ করা। কিন্তু একজন অপরাধী মানুষের বদলে কি একটি অবলা পশুর প্রাণ সমতুল্য হতে পারে? আইনের যুক্তি বলে, রক্তের বদলে রক্ত, প্রাণের বদলে প্রাণ। আপনার গুনাহ যদি হয় পাহাড়সম, তবে তার মূল্য দেওয়ার জন্য এমন এক সত্তার রক্ত প্রয়োজন যার কোনো গুনাহ নেই, যিনি পবিত্র এবং যাঁর প্রাণের মূল্য আপনার এবং আমার চেয়ে কোটি গুণ বেশি।
তাওরাত শরীফ এবং ইঞ্জিল শরীফের পাতায় পাতায় আল্লাহ চিৎকার করে বলছেন যে, এই পশুর কুরবানিগুলো ছিল একটি 'ওয়াদা'। আল্লাহ ওয়াদা করেছিলেন, তিনি নিজেই এমন এক "নিষ্পাপ মেষশাবক" বা "কুরবানি" পাঠাবেন যিনি হবে সমস্ত মানবজাতির গুনাহর একক সমাধান।
আজ নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনি কি এখনো প্রতি বছর পশুর গলায় ছুরি চালিয়ে মনে মনে এই আত্মতুষ্টিতে ভুগছেন যে আপনার গুনাহ মাফ হয়ে গেছে? নাকি আপনার আত্মা আজ সেই "মহান কুরবানিকে" খুঁজছে যা ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই অসমাপ্ত কুরবানিকে পূর্ণতা দিতে এসেছিল? সেই "জবেহিল আজিম" কে, যাঁর পবিত্র রক্তের এক ফোঁটা আপনার সারাজীবনের সমস্ত অন্ধকার মুছে দেওয়ার শক্তি রাখে?
যদি আপনি মনে করেন একটি পশুর রক্তই আপনার নাজাতের জন্য যথেষ্ট, তবে আপনি সত্য থেকে অনেক দূরে আছেন। আর যদি আপনি সেই মহান নাজাতদাতার সন্ধান পেতে চান, যাঁর কথা আল্লাহ সকল কিতাবে ইশারা দিয়ে রেখেছেন, তবে পরবর্তী অধ্যায়টি আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যের মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্ত হতে যাচ্ছে। আপনি কি সেই সত্য সইতে পারবেন?
Noted:
“ইসমাইলকে নাকি ইসাহাককে কুরবানি করার জন্য ইব্রাহিম (আ.) নিয়ে গিয়েছিলেন?
১. কোরআনের বক্তব্য:
কোরআনের সূরা আস-সাফফাত (৩৭:১০০-১১৩) আয়াতে ইব্রাহিম (আ.)-এর কুরবানির কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, পুরো কোরআনে কোথাও সরাসরি কারো নাম উল্লেখ করা হয়নি যে কোন পুত্রকে কুরবানি দেওয়া হচ্ছিল। সেখানে শুধু 'গোলামিন হালিম' (ধৈর্যশীল পুত্র) বলা হয়েছে।
২. হাদিস ও ঐতিহাসিক মতভেদ:
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবী এবং তাবেয়ীদের মধ্যে এ নিয়ে দুটি মত তৈরি হয়:
ইসাহাক (আ.)-এর পক্ষে মত: প্রখ্যাত সাহাবী হযরত উমর (রা.), হযরত আলী (রা.), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এবং হযরত আব্বাস (রা.)-এর মতো বড় বড় সাহাবীদের মতে কুরবানিযোগ্য পুত্র ছিলেন ইসাহাক (আ.)। এমনকি ইবনে জারীর তাবারী তাঁর বিখ্যাত তাফসিরে ইসাহাক (আ.)-এর পক্ষেই জোরালো মত দিয়েছেন।
ইসমাইল (আ.)-এর পক্ষে মত: পরবর্তীকালে অনেক আলেম ইসমাইল (আ.)-এর পক্ষে মত দেন, যা বর্তমানে মুসলিম সমাজে সর্বাধিক প্রচলিত। (পরবর্তীতে সমস্ত তথ্য প্রমান ও যুক্তি সহকারে এই বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করবো।)
৩. বাইবেলের বক্তব্য:
বাইবেলের আদিপুস্তক (পয়দায়েশ) ২২ অধ্যায়ে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ ইব্রাহিমকে তাঁর "একমাত্র পুত্র ইসহাককে" মোরিয়া পাহাড়ে কুরবানি দিতে বলেছিলেন।”
একটু স্থির হয়ে চিন্তা করুন। একজন নবীর জীবনের বিনিময়ে আল্লাহ যা পাঠালেন, তাকে আল্লাহ বলছেন "আজিম" বা "মহান"। একটি পশু কি কখনো একজন নবীর প্রাণের চেয়ে মহান হতে পারে? কক্ষনো না! তবে কি আল্লাহ এখানে আমাদের চোখের সামনে এক মহাবিস্ময়কর রহস্য লুকিয়ে রেখেছেন? আল্লাহ আসলে এখানে ইশারা দিচ্ছিলেন যে, মানুষের গুনাহর শাস্তি থেকে মুক্তি পেতে কেবল একটি পশুর রক্ত যথেষ্ট নয়। ইসমাইলকে (ইতিহাস অনুসারে) বাঁচানোর জন্য যে পশুটি এসেছিল, সেটি ছিল ভবিষ্যতের এক "চূড়ান্ত ও মহান কুরবানির" ছায়ামাত্র!

কে সেই "মহান কুরবানি"?
পবিত্র কোরআন এবং পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ কি এই বিষয়ে কোন নির্দিষ্ট ইশারা করেছেন?