white printer paper on white textile
white printer paper on white textile

বাইবেল কি সত্যিই বিকৃত হয়েছে?

১৪০০ বছরের সবচেয়ে বড় দাবির রহস্যময় ইতিহাস উন্মোচন

আপনি যদি একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম হন, তাহলে আপনাকে ছোটবেলা থেকে একটি কথা শেখানো হয়েছে: "বাইবেল বিকৃত হয়ে গেছে।" আপনার মসজিদের ইমাম সাহেব বলেছেন। আপনার মাদ্রাসার উস্তাদ বলেছেন। ইউটিউবে ইসলামী বক্তারা বলেছেন। এমনকি আপনার পরিবারের বড়রাও বলেছেন।

কিন্তু আপনি কি কখনো নিজে যাচাই করে দেখেছেন এই দাবিটি সত্য কি না?

আপনি কি কখনো জিজ্ঞাসা করেছেন: বাইবেলের কোন অংশ বিকৃত হয়েছে? কে বিকৃত করেছে? কখন বিকৃত করেছে? কেন বিকৃত করেছে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: কোরআন নিজে এই বিষয়ে কী বলে?

আজকের এই লেখাটি আপনার জন্য। এই লেখায় আমরা কোরআন, হাদিস, ইসলামী ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, পাণ্ডুলিপি বিজ্ঞান এবং ঐতিহাসিক তথ্যের আলোকে এই দাবিটি পরীক্ষা করব। এবং যা পাব তা আপনাকে চমকে দেবে। কারণ সত্যটা আপনি যা শুনেছেন তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এই লেখাটি দীর্ঘ। কিন্তু আপনার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য কিছুটা সময় দেওয়া কি ঠিক নয়? চলুন শুরু করি।

প্রথম অধ্যায়: কোরআন বাইবেল সম্পর্কে আসলে কী বলে?

এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ বেশিরভাগ মুসলিম মনে করেন কোরআন বলেছে বাইবেল বিকৃত। কিন্তু আসলে কি তাই?

চলুন কোরআনের আয়াতগুলো সরাসরি পড়ি। কোনো মানুষের ব্যাখ্যা নয়, আল্লাহর নিজের কথা।

সূরা মায়েদা ৫:৪৩

"তারা তোমার কাছে কিভাবে বিচার চায়, অথচ তাদের কাছে তাওরাত আছে, যাতে আল্লাহর হুকুম রয়েছে?"

এই আয়াতে আল্লাহ বলছেন তাওরাতে আল্লাহর হুকুম আছে। যদি তাওরাত বিকৃত হয়ে থাকত, তাহলে আল্লাহ কি বলতেন "তাতে আল্লাহর হুকুম আছে"? আল্লাহ কি মিথ্যা বলবেন? আল্লাহ কি একটি বিকৃত কিতাবকে "আল্লাহর হুকুমসম্পন্ন" বলবেন?

সূরা মায়েদা ৫:৪৬-৪৭

"এবং তাদের পশ্চাতে আমি মরিয়মের পুত্র ঈসাকে পাঠিয়েছিলাম তাঁর সামনে তাওরাতে যা ছিল তার সমর্থনকারী হিসেবে। এবং আমি তাঁকে ইঞ্জিল দিয়েছিলাম, যাতে হেদায়াত ও আলো আছে এবং যা তার সামনে তাওরাতে আছে তার সমর্থনকারী। এবং ইঞ্জিলের অনুসারীরা আল্লাহ তাতে যা অবতীর্ণ করেছেন সে অনুযায়ী বিচার করুক।"

এই আয়াতে দুটি বিষয় স্পষ্ট।

প্রথমত, আল্লাহ বলছেন ইঞ্জিলে "হেদায়াত ও আলো আছে।" বর্তমান কালে বলছেন, অতীত কালে নয়। "ছিল" বলেননি, "আছে" বলেছেন।

দ্বিতীয়ত, আল্লাহ ইঞ্জিলের অনুসারীদের আদেশ দিচ্ছেন ইঞ্জিল অনুযায়ী বিচার করতে। যদি ইঞ্জিল বিকৃত হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহ কি একটি বিকৃত কিতাব অনুযায়ী বিচার করতে বলবেন? আল্লাহ কি মানুষকে ভুল পথে চালাবেন?

সূরা মায়েদা ৫:৬৮

"বলো, হে আহলে কিতাব! তোমরা কোনো ভিত্তির ওপর নেই যতক্ষণ না তোমরা তাওরাত ও ইঞ্জিল এবং তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা প্রতিষ্ঠিত করো।"

আল্লাহ আহলে কিতাবদের বলছেন তাওরাত ও ইঞ্জিল "প্রতিষ্ঠিত" করতে। অর্থাৎ মেনে চলতে, পালন করতে। যদি কিতাবগুলো বিকৃত হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহ কেন বলবেন এগুলো মানো?

সূরা ইউনুস ১০:৯৪

"অতঃপর তুমি যদি সন্দেহে থাকো তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে সে বিষয়ে, তাহলে তাদের জিজ্ঞাসা করো যারা তোমার আগে থেকে কিতাব পড়ে আসছে।"

এই আয়াতটি অত্যন্ত চমকপ্রদ। আল্লাহ স্বয়ং মুহাম্মদ (সা.) কে বলছেন: যদি সন্দেহ হয়, তাহলে আগের কিতাবধারীদের জিজ্ঞাসা করো। অর্থাৎ তাওরাত ও ইঞ্জিলের অনুসারীদের।

এখন চিন্তা করুন। আল্লাহ কি তাঁর নবীকে একটি বিকৃত কিতাবের অনুসারীদের কাছে পাঠাবেন সত্য যাচাই করতে? আল্লাহ কি তাঁর নবীকে ভুল পথে পরিচালিত করবেন?

সূরা আনকাবুত ২৯:৪৬

"তোমরা আহলে কিতাবদের সাথে তর্ক করো না সবচেয়ে সুন্দর পন্থা ছাড়া। এবং বলো, আমরা ঈমান এনেছি আমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তোমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তার প্রতি। এবং আমাদের ইলাহ ও তোমাদের ইলাহ এক।"

"তোমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তার প্রতি ঈমান এনেছি।" আল্লাহ বলছেন আমরা (মুসলিমরা) তাওরাত ও ইঞ্জিলে ঈমান এনেছি। যদি এই কিতাবগুলো বিকৃত হয়ে থাকে, তাহলে বিকৃত কিতাবে ঈমান আনার আদেশ কি আল্লাহ দেবেন?

সূরা বাকারা ২:১৩৬

"তোমরা বলো, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি এবং আমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তাঁদের বংশধরদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং মূসা ও ঈসাকে যা দেওয়া হয়েছে এবং অন্যান্য নবীদের তাদের রবের পক্ষ থেকে যা দেওয়া হয়েছে তার প্রতি। আমরা তাঁদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করি না।"

"মূসা ও ঈসাকে যা দেওয়া হয়েছে তার প্রতি ঈমান।" এটি পরিষ্কার। আল্লাহ বলছেন তাওরাত ও ইঞ্জিলে ঈমান আনতে।

সূরা আল ইমরান ৩:৩-৪

"তিনি তোমার প্রতি সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, তার আগে যা এসেছে তার সমর্থনকারী হিসেবে। এবং তিনি তাওরাত ও ইঞ্জিল অবতীর্ণ করেছেন ইতিপূর্বে মানুষের হেদায়াতের জন্য।"

"মানুষের হেদায়াতের জন্য।" আল্লাহ নিজে বলছেন তাওরাত ও ইঞ্জিল মানুষের হেদায়াতের জন্য। হেদায়াত মানে সঠিক পথের দিকনির্দেশনা। একটি বিকৃত কিতাব কি হেদায়াত দিতে পারে?

দ্বিতীয় অধ্যায়: তাহলে "তাহরিফ" এর ধারণা কোথা থেকে এলো?

অনেক মুসলিম পণ্ডিত "তাহরিফ" (تحريف) শব্দটি ব্যবহার করেন বাইবেলের বিকৃতি বোঝাতে। তারা কোরআনের কিছু আয়াত উদ্ধৃত করেন যেখানে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।

আসুন দেখি কোরআনে "তাহরিফ" শব্দটি আসলে কী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

সূরা বাকারা ২:৭৫

"তোমরা কি আশা করো যে তারা তোমাদের জন্য ঈমান আনবে, অথচ তাদের একটি দল আল্লাহর কালাম শুনতো এবং তারপর তা বুঝার পরও ইচ্ছাকৃতভাবে তা বিকৃত করতো?"

এখানে "তাহরিফ" শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু লক্ষ্য করুন, এখানে বলা হচ্ছে "তারা শুনতো এবং তারপর বিকৃত করতো।" এটি মৌখিক বিকৃতি, লিখিত কিতাবের বিকৃতি নয়। তারা আল্লাহর কথা শুনতো এবং মুখে বলার সময় পাল্টে দিত।

সূরা নিসা ৪:৪৬

"ইহুদিদের মধ্যে কিছু লোক আছে যারা কালামকে তার স্থান থেকে সরিয়ে দেয়।"

এখানে "ইউহাররিফূনা আল কালিমা আন মাওয়াদিইহি" অর্থাৎ "তারা কালামকে তার স্থান থেকে সরিয়ে দেয়।" এর অর্থ হতে পারে দুটি:

প্রথম অর্থ: তারা আয়াতের অর্থ পাল্টে দেয়, অর্থাৎ ভুল ব্যাখ্যা করে।

দ্বিতীয় অর্থ: তারা আয়াতকে তার প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে উপস্থাপন করে।

লক্ষ্য করুন, এখানে বলা হয়নি "তারা কিতাব পাল্টে দিয়েছে" বা "তারা লিখিত পাঠ্য পরিবর্তন করেছে।" বলা হয়েছে "তারা কালামকে তার স্থান থেকে সরায়।" এটি ব্যাখ্যার বিকৃতি, মূল পাঠ্যের বিকৃতি নয়।

ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ বুখারীতে (কিতাবুত তাওহীদ, বাবু মা ইউযকারু ফি যাতিল্লাহি ওয়া সিফাতিহি) একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন:

"তাহরিফ মানে হলো শব্দের অর্থ পরিবর্তন করা। আল্লাহর কোনো সৃষ্টির পক্ষে আল্লাহর কিতাবের একটি শব্দও পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, না তাওরাতের, না ইঞ্জিলের। তবে তারা অর্থ বিকৃত করে, অর্থাৎ ভুল ব্যাখ্যা করে।"

এটি স্বয়ং ইমাম বুখারীর কথা। ইসলামের সবচেয়ে বিশ্বস্ত হাদিস সংকলকের কথা। তিনি পরিষ্কার বলছেন: তাওরাত ও ইঞ্জিলের লিখিত পাঠ্য পরিবর্তন করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়।

ইমাম ফখরুদ্দিন রাযী তাঁর তাফসীরে কবির (মাফাতিহুল গাইব) গ্রন্থে সূরা বাকারা ২:৭৫ এর ব্যাখ্যায় লিখেছেন:

"তাহরিফ দুই প্রকার: তাহরিফুল মানা (অর্থের বিকৃতি) এবং তাহরিফুল লাফয (শব্দের বিকৃতি)। এখানে তাহরিফুল মানা বোঝানো হয়েছে, কারণ তাওরাত ও ইঞ্জিলের মতো ব্যাপকভাবে প্রচলিত কিতাবের শব্দ পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।"

অর্থাৎ, ইসলামের দুজন শীর্ষস্থানীয় আলেম একই কথা বলছেন: তাওরাত ও ইঞ্জিলের মূল পাঠ্য পরিবর্তন হয়নি। যা হয়েছে তা হলো কিছু মানুষ ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছে।

তৃতীয় অধ্যায়: ইসলামী ইতিহাসে কে প্রথম "বাইবেল বিকৃত" দাবি করেছিলেন?

এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ প্রথম কয়েক শতাব্দীর মুসলিম আলেমরা বাইবেল বিকৃত বলে বিশ্বাস করতেন না।

ইবন খালদুন, ইসলামী ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ঐতিহাসিক, তাঁর "মুকাদ্দিমা" গ্রন্থে লিখেছেন যে প্রাথমিক যুগের মুসলিম আলেমরা তাওরাত ও ইঞ্জিলের পাঠ্য (text) বিকৃত হয়েছে বলে বিশ্বাস করতেন না। তারা বিশ্বাস করতেন যে ইহুদি ও খ্রিস্টানরা ভুল ব্যাখ্যা দেয়, কিন্তু মূল কিতাব অক্ষত আছে।

ইবন হাযম (৯৯৪-১০৬৪ খ্রি.), আন্দালুসিয়ার একজন বিখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত, তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি প্রথম ব্যাপকভাবে "বাইবেলের পাঠ্য বিকৃত হয়েছে" এই দাবি করেছিলেন। তাঁর "আল ফিসাল ফিল মিলাল ওয়ান নিহাল" গ্রন্থে তিনি এই দাবি বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেছেন।

কিন্তু ইবন হাযম এই দাবি করেছিলেন একটি বিশেষ কারণে। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে বাইবেলের কিছু বর্ণনা কোরআনের সাথে মিলে না। এবং তিনি ধরে নিয়েছিলেন কোরআন সঠিক এবং বাইবেল ভুল, তাই বাইবেল অবশ্যই বিকৃত হয়েছে।

কিন্তু তাঁর আগে ৪০০ বছর ধরে মুসলিম আলেমরা এই দাবি করেননি। ইবন হাযমের আগের প্রধান মুসলিম আলেমদের মধ্যে ইমাম তাবারী, ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফিঈ এবং ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল কেউই বাইবেলের পাঠ্য বিকৃত হয়েছে এমন দাবি করেননি।

এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। ইসলামের প্রথম ৪০০ বছরে কেউ বাইবেল বিকৃত বলেননি। এই দাবি পরবর্তীতে এসেছে এবং ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়েছে।

চতুর্থ অধ্যায়: আল্লাহ কি তাঁর কিতাব রক্ষা করতে পারেন না?

এখন একটি ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্ন করি যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, সূরা হিজর ১৫:৯ এ: "নিশ্চয় আমিই যিকির (স্মরণিকা) অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক।"

মুসলিমরা এই আয়াত উদ্ধৃত করেন এবং বলেন এই আয়াত শুধু কোরআনের সংরক্ষণের কথা বলছে, তাওরাত ও ইঞ্জিলের নয়।

কিন্তু এখানে কয়েকটি প্রশ্ন আছে।

প্রথম প্রশ্ন: "যিকির" শব্দটি কি শুধু কোরআনকে বোঝায়? কোরআনে "যিকির" শব্দটি তাওরাতের জন্যও ব্যবহৃত হয়েছে। সূরা আম্বিয়া ২১:১০৫ এ বলা হয়েছে: "আমি যিকিরের (জবুরের) পরে লিখে দিয়েছি যে জমিন আমার সৎকর্মশীল বান্দারা উত্তরাধিকার হিসেবে পাবে।" এখানে "যিকির" দ্বারা জবুর (গীতসংহিতা) বোঝানো হয়েছে।

দ্বিতীয় প্রশ্ন: যদি আল্লাহ কোরআন সংরক্ষণ করতে পারেন, তাহলে তিনি কি তাওরাত ও ইঞ্জিল সংরক্ষণ করতে পারেন না? আল্লাহর ক্ষমতা কি কোরআনে সীমাবদ্ধ?

তৃতীয় প্রশ্ন: যদি আল্লাহ তাওরাত ও ইঞ্জিল সংরক্ষণ না করে থাকেন, তাহলে কেন তিনি মুহাম্মদ (সা.) এর সময়েও মানুষদের বলছেন তাওরাত ও ইঞ্জিল মানতে? কেন তিনি মুহাম্মদ (সা.) কে বলছেন আগের কিতাবধারীদের জিজ্ঞাসা করতে? একটি অসংরক্ষিত, বিকৃত কিতাবের অনুসারীদের কাছে কেন পাঠাবেন?

চতুর্থ প্রশ্ন: আল্লাহ যদি তাঁর নিজের কিতাব রক্ষা করতে না পারেন, তাহলে আল্লাহ কি সর্বশক্তিমান? এটি আল্লাহর সর্বশক্তিমানতার প্রশ্ন। আল্লাহ বলেছেন "আমিই সংরক্ষক।" যদি তাওরাত ও ইঞ্জিল বিকৃত হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহ তাঁর কথা রাখতে পারেননি। এটি কি আল্লাহর চরিত্রের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ?

পঞ্চম অধ্যায়: পাণ্ডুলিপি বিজ্ঞানের সাক্ষ্য

এখন আসুন বিজ্ঞানের দিকে তাকাই। প্রত্নতত্ত্ব এবং পাণ্ডুলিপি বিজ্ঞান কী বলছে?

বাইবেলের প্রাচীনতম পাণ্ডুলিপিগুলো বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন যাদুঘর ও গবেষণাগারে সংরক্ষিত আছে। চলুন কয়েকটি দেখি।

মৃত সাগরের পাণ্ডুলিপি (Dead Sea Scrolls)

১৯৪৭ সালে জর্ডানের কুমরান গুহায় একজন বেদুঈন রাখাল একটি অসাধারণ আবিষ্কার করলেন। তিনি কিছু মাটির পাত্র পেলেন যার মধ্যে চামড়ার স্ক্রোল ছিল। এগুলোই হলো মৃত সাগরের পাণ্ডুলিপি।

এই পাণ্ডুলিপিগুলো খ্রিস্টপূর্ব ২৫০ থেকে ৬৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে লেখা হয়েছিল। অর্থাৎ ঈসা মসীহের জন্মের আগে থেকে তাঁর সময় পর্যন্ত। এবং মুহাম্মদ (সা.) এর জন্মের প্রায় ৬০০ বছর আগে।

এই পাণ্ডুলিপিতে তাওরাতের (ওল্ড টেস্টামেন্টের) প্রায় প্রতিটি বইয়ের অংশ পাওয়া গেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো ইশাইয়া নবীর (যিশাইয়) পুরো স্ক্রোল, যা "Great Isaiah Scroll" নামে পরিচিত। এটি প্রায় ২২০০ বছর পুরনো।

এখন চমকপ্রদ তথ্য হলো: এই ২২০০ বছর পুরনো পাণ্ডুলিপি আজকের হিব্রু বাইবেলের (মাসোরেটিক টেক্সট) সাথে তুলনা করা হয়েছে। এবং পাওয়া গেছে যে দুটি টেক্সটের মধ্যে ৯৫% হুবহু একই। বাকি ৫% পার্থক্য হলো ছোটখাটো বানান পার্থক্য এবং কিছু শব্দের সামান্য ভিন্নতা, যা অর্থের কোনো পরিবর্তন করেনি।

এটি প্রমাণ করে যে ২২০০ বছরে তাওরাতের টেক্সটে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।

কোডেক্স সিনাইটিকাস (Codex Sinaiticus)

এটি বাইবেলের সবচেয়ে পুরনো সম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি। এটি প্রায় ৩৩০-৩৬০ খ্রিস্টাব্দে লেখা হয়েছিল। অর্থাৎ মুহাম্মদ (সা.) এর জন্মের প্রায় ২৫০ বছর আগে।

এই পাণ্ডুলিপি বর্তমানে ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে এবং অনলাইনে (codexsinaiticus.org) যে কেউ দেখতে পারেন।

এই পাণ্ডুলিপিতে নতুন নিয়ম (ইঞ্জিল এবং সংশ্লিষ্ট পুস্তকগুলো) সম্পূর্ণ আছে। এবং এটি আজকের বাইবেলের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় যে মূল বার্তায় কোনো পার্থক্য নেই।

কোডেক্স ভ্যাটিকানাস (Codex Vaticanus)

এটি আরেকটি অত্যন্ত প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, প্রায় ৩২৫-৩৫০ খ্রিস্টাব্দে লেখা। এটি ভ্যাটিকান লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে।

বোদমার প্যাপাইরাস (Bodmer Papyrus)

এটি দ্বিতীয় শতাব্দীর (১৭০-২০০ খ্রি.) একটি পাণ্ডুলিপি। এতে ইঞ্জিলের যোহন (ইউহোন্না) পুস্তকের বড় অংশ আছে। এটি ঈসার মৃত্যুর মাত্র ১০০-১৫০ বছর পরে লেখা।

চেস্টার বিটি প্যাপাইরাস (Chester Beatty Papyrus)

এটি তৃতীয় শতাব্দীর (২০০-২৫০ খ্রি.) একটি পাণ্ডুলিপি। এতে ইঞ্জিলের চারটি পুস্তকের (মথি, মার্ক, লূক, যোহন) অংশবিশেষ আছে।

জন রাইল্যান্ডস ফ্র্যাগমেন্ট (John Rylands Fragment P52)

এটি ইঞ্জিলের সবচেয়ে পুরনো পরিচিত পাণ্ডুলিপি। এটি প্রায় ১২৫ খ্রিস্টাব্দে লেখা হয়েছিল, ঈসার মৃত্যুর মাত্র ৯৫ বছর পরে এবং যোহন পুস্তকের লেখকের জীবদ্দশায় বা তার কিছুকাল পরে। এতে যোহন ১৮:৩১-৩৩ এবং ১৮:৩৭-৩৮ আছে।

এবং এই প্রাচীন পাণ্ডুলিপিটি আজকের বাইবেলের যোহন পুস্তকের সাথে হুবহু একই।

সারসংক্ষেপ: পাণ্ডুলিপির সাক্ষ্য

বাইবেলের নতুন নিয়মের (ইঞ্জিল ও সংশ্লিষ্ট পুস্তক) জন্য বর্তমানে ৫,৮০০ এরও বেশি গ্রিক পাণ্ডুলিপি, ১০,০০০ এরও বেশি ল্যাটিন পাণ্ডুলিপি এবং ৯,৩০০ এরও বেশি অন্যান্য ভাষার পাণ্ডুলিপি আছে। মোট ২৫,০০০ এরও বেশি পাণ্ডুলিপি।

তুলনায়, প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের সবচেয়ে বেশি পাণ্ডুলিপি আছে হোমারের "ইলিয়াড" এর, মাত্র ১,৫০০টি।

পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাচীন গ্রন্থের এত বেশি পাণ্ডুলিপি নেই। এবং এই ২৫,০০০ পাণ্ডুলিপির মধ্যে মূল বার্তায় কোনো পার্থক্য নেই।

যদি কেউ বাইবেল বিকৃত করতে চাইত, তাহলে তাকে একই সময়ে তিন মহাদেশে (এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ) ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার পাণ্ডুলিপি একই সাথে পরিবর্তন করতে হতো। এটি কি সম্ভব?

ষষ্ঠ অধ্যায়: ঐতিহাসিক যুক্তি

এখন কিছু ঐতিহাসিক যুক্তি দেখি।

প্রথম যুক্তি: কে বিকৃত করল?

যদি বাইবেল বিকৃত হয়ে থাকে, তাহলে কে করল? খ্রিস্টানরা? কিন্তু কোন খ্রিস্টান? প্রথম শতাব্দীতে খ্রিস্টানরা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিলেন: রোম, গ্রিস, মিশর, সিরিয়া, ইথিওপিয়া, ভারত। তারা বিভিন্ন ভাষায় কথা বলতেন: গ্রিক, ল্যাটিন, সিরীয়, কপটিক, আর্মেনীয়, ইথিওপীয়। তারা একে অপরের সাথে সবসময় যোগাযোগও রাখতে পারতেন না।

এই সব ভিন্ন ভিন্ন দেশে, ভিন্ন ভিন্ন ভাষায়, ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের হাতে থাকা সব পাণ্ডুলিপি একই সাথে, একই ভাবে পরিবর্তন করা কি সম্ভব?

দ্বিতীয় যুক্তি: কখন বিকৃত হলো?

যদি বাইবেল বিকৃত হয়ে থাকে, তাহলে কখন হলো?

মুহাম্মদ (সা.) এর আগে? তাহলে কোরআন কেন বলছে তাওরাত ও ইঞ্জিল মানতে? কোরআন কি একটি বিকৃত কিতাব মানতে বলবে?

মুহাম্মদ (সা.) এর পরে? কিন্তু আমাদের কাছে মুহাম্মদ (সা.) এর আগের পাণ্ডুলিপি আছে, যেমন কোডেক্স সিনাইটিকাস (৩৩০ খ্রি.) এবং মৃত সাগরের পাণ্ডুলিপি (খ্রিস্টপূর্ব ২৫০)। এবং এগুলো আজকের বাইবেলের সাথে মিলে যায়। তাহলে পরে বিকৃত হওয়ার প্রশ্নই আসে না।

তৃতীয় যুক্তি: কেন বিকৃত করবে?

যদি খ্রিস্টানরা বাইবেল বিকৃত করত, তাহলে কেন করত? তাদের কী লাভ?

যদি তারা ঈসাকে ঈশ্বর বানাতে চাইত, তাহলে কেন বাইবেলে ঈসার দুর্বলতার কথা রেখে দিল? বাইবেলে আছে ঈসা কেঁদেছেন (যোহন ১১:৩৫), ক্লান্ত হয়েছেন (যোহন ৪:৬), ক্ষুধার্ত হয়েছেন (মথি ৪:২), ভয় পেয়েছেন (মার্ক ১৪:৩৩)।

যদি তারা বাইবেল বিকৃত করত, তাহলে এই "দুর্বলতা"গুলো মুছে ফেলত। কিন্তু মুছে ফেলেনি। কারণ বাইবেল সত্য এবং সত্য যেমন আছে তেমনই রাখা হয়েছে।

চতুর্থ যুক্তি: ইহুদিদের ভূমিকা

বাইবেলের পুরাতন নিয়ম (তাওরাত ও অন্যান্য) ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ। খ্রিস্টানরা এবং ইহুদিরা একে অপরের বিরোধী ছিল। ইহুদিরা ঈসাকে মসীহ হিসেবে গ্রহণ করেনি।

এখন যদি খ্রিস্টানরা পুরাতন নিয়ম বিকৃত করত, তাহলে ইহুদিরা কি চুপ থাকত? তারা তো সাথে সাথে বলত, "তোমরা আমাদের কিতাব পাল্টে দিয়েছ!"

কিন্তু ইহুদিরা কখনো এই অভিযোগ করেনি। কারণ পুরাতন নিয়মের টেক্সট পরিবর্তন হয়নি।

একইভাবে, ইহুদিদের কাছে থাকা তাওরাত এবং খ্রিস্টানদের কাছে থাকা তাওরাত হুবহু একই। দুটি বিরোধী সম্প্রদায়ের কাছে একই টেক্সট। এটি কি প্রমাণ করে না যে টেক্সট অক্ষত আছে?

সপ্তম অধ্যায়: কোরআন নিজে কি তাহলে বাইবেলকে সত্যায়ন করে?

এই প্রশ্নের উত্তর হলো: হ্যাঁ।

কোরআন নিজেকে বলে "মুসাদ্দিক" অর্থাৎ "সত্যায়নকারী।" কোরআন আগের কিতাবগুলোকে সত্যায়ন করে, বাতিল করে না।

সূরা বাকারা ২:৪১ এ বলা হয়েছে: "এবং আমি যা অবতীর্ণ করেছি তার প্রতি ঈমান আনো, যা তোমাদের কাছে যা আছে তার সত্যায়নকারী।"

সূরা আল ইমরান ৩:৩ এ বলা হয়েছে: "তিনি তোমার প্রতি সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, তার আগে যা এসেছে তার সত্যায়নকারী।"

সূরা ফাতির ৩৫:৩১ এ বলা হয়েছে: "আমি তোমার প্রতি যে কিতাব ওহী করেছি তা সত্য, তার আগে যা এসেছে তার সত্যায়নকারী।"

"সত্যায়নকারী" মানে হলো কোরআন সাক্ষ্য দিচ্ছে যে আগের কিতাবগুলো সত্য। যদি আগের কিতাবগুলো বিকৃত হয়ে থাকত, তাহলে কোরআন কিভাবে একটি বিকৃত কিতাবকে "সত্যায়ন" করবে?

এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী যুক্তি। কোরআন নিজেই বাইবেলের সত্যতার সাক্ষী।

অষ্টম অধ্যায়: হাদিসে বাইবেল সম্পর্কে কী বলা আছে?

সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৭৫৪২

আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা.) থেকে বর্ণিত: "একদল ইহুদি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে এলো এবং বলল তাদের একজন পুরুষ ও একজন নারী ব্যভিচার করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, তাওরাতে এই বিষয়ে কী আছে? তারা বলল, আমরা তাদের অপমানিত করি এবং চাবুক মারি। আবদুল্লাহ ইবন সালাম বললেন, তোমরা মিথ্যা বলছ। তাওরাতে রজমের বিধান আছে। তারা তাওরাত এনে খুলল এবং তাদের একজন রজমের আয়াতের ওপর হাত রাখল। আবদুল্লাহ ইবন সালাম বললেন, তোমার হাত সরাও। তখন দেখা গেল রজমের আয়াত সেখানে আছে।"

এই হাদিসে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে।

প্রথমত, রাসূলুল্লাহ (সা.) তাওরাত দিয়ে বিচার করতে বলেছেন। তিনি বলেননি "তাওরাত বিকৃত, তাই কোরআন দিয়ে বিচার করো।"

দ্বিতীয়ত, তাওরাত আনা হলো এবং খোলা হলো। এবং সেখানে সঠিক আয়াত পাওয়া গেল। তাওরাত বিকৃত হয়নি, তাওরাতে সঠিক বিধান আছে।

তৃতীয়ত, সমস্যাটি ছিল ইহুদিদের, তারা তাওরাতের আয়াত লুকাচ্ছিল। কিন্তু আয়াত সেখানেই ছিল। এটি "তাহরিফুল মানা" অর্থাৎ ব্যাখ্যার বিকৃতি, টেক্সটের বিকৃতি নয়।

সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৪৪৯

এই হাদিসেও একই ঘটনার বর্ণনা আছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তাওরাত নিয়ে এসো।" এবং তাওরাত দিয়ে বিচার করেছেন।

নবম অধ্যায়: প্রাচীন মুসলিম আলেমদের সাক্ষ্য

এখন দেখি প্রাচীন মুসলিম আলেমরা বাইবেল সম্পর্কে কী বলেছেন।

আলী ইবন রাব্বান আত তাবারী (মৃত্যু ৮৫৫ খ্রি.)

তিনি ছিলেন একজন খ্রিস্টান থেকে ইসলামে ধর্মান্তরিত পণ্ডিত। তাঁর "আদ দ্বীন ওয়াদ দাওলা" গ্রন্থে তিনি বাইবেল থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে মুহাম্মদ (সা.) এর নবুওয়াত প্রমাণ করতে চেয়েছেন। তিনি কখনো বলেননি বাইবেল বিকৃত। বরং তিনি বাইবেলকে প্রামাণিক হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া (১২৬৩-১৩২৮ খ্রি.)

ইমাম ইবনে তাইমিয়া তাঁর "আল জাওয়াবুস সাহীহ লিমান বাদ্দালা দ্বীনাল মাসীহ" গ্রন্থে লিখেছেন: "মুসলিম আলেমদের মধ্যে এই বিষয়ে তিনটি মত আছে: কেউ বলেন সব বিকৃত, কেউ বলেন কিছুই বিকৃত হয়নি, এবং কেউ বলেন কিছু অংশ বিকৃত।" তিনি নিজে তৃতীয় মত পোষণ করতেন। কিন্তু তিনি স্বীকার করেছেন যে "কিছুই বিকৃত হয়নি" এটিও একটি বৈধ ইসলামী মত।

ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (১৭০৩-১৭৬২ খ্রি.)

তিনি তাঁর "আল ফাওযুল কবীর ফি উসূলিত তাফসির" গ্রন্থে লিখেছেন: "তাওরাত ও ইঞ্জিলের মূল বক্তব্য সংরক্ষিত আছে। যা পরিবর্তিত হয়েছে তা হলো কিছু ব্যাখ্যা ও কিছু ঐতিহাসিক বিবরণ, মূল ধর্মীয় শিক্ষা নয়।"

দশম অধ্যায়: যদি বাইবেল বিকৃত হয়ে থাকে, তাহলে কোরআন সমস্যায় পড়ে

এখন সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তিটি দেখি।

যদি আমরা মেনে নিই যে বাইবেল বিকৃত হয়েছে, তাহলে কোরআন নিজেই সমস্যায় পড়ে। কেন?

প্রথমত, কোরআন বলছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে আল্লাহর হুকুম আছে (সূরা মায়েদা ৫:৪৩)। যদি কিতাব বিকৃত হয়ে থাকে, তাহলে কোরআন ভুল তথ্য দিচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, কোরআন বলছে ইঞ্জিলে হেদায়াত ও আলো আছে (সূরা মায়েদা ৫:৪৬)। যদি ইঞ্জিল বিকৃত হয়ে থাকে, তাহলে কোরআন মিথ্যা বলছে।

তৃতীয়ত, কোরআন মুহাম্মদ (সা.) কে বলছে আগের কিতাবধারীদের জিজ্ঞাসা করতে (সূরা ইউনুস ১০:৯৪)। যদি তাদের কিতাব বিকৃত হয়ে থাকে, তাহলে কোরআন নবীকে ভুল পথে পাঠাচ্ছে।

চতুর্থত, কোরআন নিজেকে বলছে আগের কিতাবের "সত্যায়নকারী।" যদি আগের কিতাব মিথ্যা হয়ে থাকে, তাহলে কোরআন একটি মিথ্যাকে সত্যায়ন করছে।

অর্থাৎ, বাইবেল বিকৃত বলা মানে পরোক্ষভাবে কোরআনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।

একাদশ অধ্যায়: বাইবেল ও কোরআনের মিল

এখন আসুন দেখি বাইবেল ও কোরআনের মূল বার্তায় কতটা মিল আছে।

একত্ববাদ: বাইবেল বলে "আমাদের আল্লাহ, প্রভু এক" (দ্বিতীয় বিবরণ ৬:৪)। কোরআন বলে "তোমাদের ইলাহ একজনই" (সূরা বাকারা ২:১৬৩)।

আদম ও হাওয়ার সৃষ্টি: বাইবেল ও কোরআন উভয়েই বলছে আল্লাহ আদমকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন।

নূহের মহাপ্লাবন: বাইবেল ও কোরআন উভয়েই বলছে আল্লাহ নূহকে জাহাজ বানাতে বলেছেন এবং মহাপ্লাবনে অবিশ্বাসীদের ধ্বংস করেছেন।

ইব্রাহিমের কাহিনী: বাইবেল ও কোরআন উভয়েই ইব্রাহিমের কোরবানির ঘটনা বর্ণনা করেছে।

মূসা ও ফেরাউন: বাইবেল ও কোরআন উভয়েই মূসার মিশর থেকে বনী ইসরাইলকে নিয়ে বের হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করেছে।

ঈসার কুমারী জন্ম: বাইবেল ও কোরআন উভয়েই বলছে ঈসা কুমারী মরিয়মের গর্ভ থেকে জন্মেছেন।

ঈসার মুজেজা: বাইবেল ও কোরআন উভয়েই বলছে ঈসা মৃতকে জীবিত করেছেন, অন্ধকে দৃষ্টি দিয়েছেন, রোগীকে সুস্থ করেছেন।

যদি বাইবেল বিকৃত হয়ে থাকত, তাহলে কোরআনের সাথে এতগুলো মিল কিভাবে থাকত? বিকৃত কিতাবের সাথে আল্লাহর নতুন কিতাবের এত মিল থাকা কি সম্ভব?

দ্বাদশ অধ্যায়: বাইবেলের যে অংশগুলো কোরআনের সাথে "ভিন্ন" মনে হয়

অনেকে বলেন বাইবেলে এমন কিছু বিষয় আছে যা কোরআনের সাথে মিলে না। তাই বাইবেল বিকৃত।

কিন্তু এই যুক্তি সঠিক নয়। কেন?

কারণ "ভিন্ন হওয়া" এবং "বিকৃত হওয়া" এক কথা নয়। দুটি কিতাব দুটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে একই ঘটনা বর্ণনা করতে পারে। একটি কিতাবে বেশি বিস্তারিত থাকতে পারে, আরেকটিতে কম। এটি বিকৃতি নয়, এটি পরিপূরক বিবরণ।

উদাহরণ দিই। যদি দুজন সাক্ষী একটি দুর্ঘটনার বর্ণনা দেন, একজন বলেন "গাড়িটি লাল ছিল" এবং আরেকজন বলেন "গাড়িটি দ্রুত যাচ্ছিল," এর মানে কি একজন মিথ্যা বলছেন? না। দুজন দুটি ভিন্ন বিষয় লক্ষ্য করেছেন। দুটি বিবরণ একে অপরের পরিপূরক।

একইভাবে, বাইবেল এবং কোরআনের মধ্যে যে পার্থক্যগুলো আছে, সেগুলো বিকৃতির প্রমাণ নয়, বরং পরিপূরক বিবরণের প্রমাণ।

শেষ কথা: আপনার জন্য একটি আমন্ত্রণ

প্রিয় পাঠক, আজকে আমরা দেখলাম:

কোরআনে কমপক্ষে ১০টি আয়াত আছে যেগুলো তাওরাত ও ইঞ্জিলের সত্যতা সমর্থন করে।

ইমাম বুখারী এবং ইমাম ফখরুদ্দিন রাযী বলেছেন তাওরাত ও ইঞ্জিলের লিখিত পাঠ্য পরিবর্তন সম্ভব নয়।

ইসলামের প্রথম ৪০০ বছরে কেউ বাইবেল বিকৃত বলেননি।

মৃত সাগরের পাণ্ডুলিপি প্রমাণ করে ২২০০ বছরে তাওরাতের টেক্সটে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।

বাইবেলের ২৫,০০০ এরও বেশি পাণ্ডুলিপি আছে এবং মূল বার্তায় কোনো পার্থক্য নেই।

রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে তাওরাত দিয়ে বিচার করেছেন।

বাইবেল বিকৃত বলা মানে পরোক্ষভাবে কোরআনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।

এখন প্রশ্ন হলো: আপনি কি বাইবেল পড়বেন?

আপনাকে কেউ জোর করছে না। আপনাকে কেউ বলছে না আপনার ধর্ম ছাড়তে। আপনাকে শুধু বলা হচ্ছে: পড়ুন। নিজে যাচাই করুন। আল্লাহ তো বলেছেন "তোমরা কি চিন্তা করো না?" (সূরা ইয়াসিন ৩৬:৬৮)

ঈসা মসীহ বলেছেন: "সত্য তোমাদের মুক্ত করবে।" (যোহন ৮:৩২)

আপনি কি সেই সত্য জানতে চান? তাহলে বাইবেল পড়ুন। ইঞ্জিল শরীফ পড়ুন। নিজে দেখুন সেখানে কী লেখা আছে। এবং তারপর নিজের সিদ্ধান্ত নিন।

আমাদের ওয়েবসাইটে আরও অনেক লেখা আছে যেগুলো আপনাকে সত্য জানতে সাহায্য করবে। আমাদের অন্যান্য লেখাগুলোও পড়ুন:

কোরআনে ঈসা মসীহকে কেন "আল্লাহর কালেমা" বলা হয়েছে?

কোরআনে ঈসা মসীহকে কেন "আল্লাহর রূহ" বলা হয়েছে?

ঈসা মসীহ কি এখনো জীবিত আছেন?

ঈসা মসীহ কি আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবেন?

একটি প্রার্থনা

হে আল্লাহ, তুমি সত্যের মালিক। তুমি তাওরাত দিয়েছ, ইঞ্জিল দিয়েছ, কোরআন দিয়েছ। তুমি চেয়েছ মানুষ সত্য জানুক। আজ আমি সত্য জানতে চাই। আমাকে ভয় থেকে মুক্ত করো, পূর্বধারণা থেকে মুক্ত করো। আমার চোখ খুলে দাও, আমার হৃদয় খুলে দাও। আমাকে তোমার সত্যের পথে চালাও। আমীন।

এই লেখাটি শেয়ার করুন। কারণ সত্য সবার জানার অধিকার। হয়তো আপনার একটি শেয়ার কারো জীবনে চিরকালের পরিবর্তন আনতে পারে।