দুর্গাপূজায় কি অশুভ শক্তির বিনাশ হয়? মানবজাতির সত্য বিজয়ী আসলে কে?

শরতের নীল আকাশ, কাশফুল আর ঢাকের শব্দে চারদিক যখন মুখরিত, তখন দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলোতে একটি চিরন্তন আশার বাণী ধ্বনিত হয়। এই উৎসবের মূল দর্শন হলো: "অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির জয়।" রূপক গল্পে মহিষাসুর নামক দানবকে বধ করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে শান্তি ফিরিয়ে আনার যে আকাঙ্ক্ষা,,, বিস্তারিত পড়ুন।

আত্মিক জিজ্ঞাসা

আল কালিমাতুল্লাহ

10/19/20261 min read

দুর্গাপূজায় কি অশুভ শক্তির বিনাশ হয়?
দুর্গাপূজায় কি অশুভ শক্তির বিনাশ হয়?

একইভাবে, একজন মুসলিম যখন মসজিদে গিয়ে শয়তানের প্ররোচনা থেকে পানাহ চান, তখন তিনিও মূলত সেই একই অশুভ শক্তির হাত থেকে মুক্তি খুঁজছেন।

কিন্তু উৎসবের জাঁকজমক শেষে যখন শান্ত নদীতে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়, কিংবা নামাজ শেষে যখন আমরা জাগতিক জীবনে ফিরে আসি, তখন একটি রূঢ় বাস্তবতা আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। আমাদের ভেতরের হিংসা, কাম, লোভ আর অহংকারের যে আসল 'অশুভ শক্তি', তা কি সত্যিই বিসর্জন হয়?

হাজার বছর ধরে মানুষ এই ধরনের আচার-অনুষ্ঠান করে আসছে, কিন্তু মানবজাতি আজও পাপ ও মৃত্যুর শৃঙ্খলেই বন্দি। তাহলে এই অশুভ শক্তি বিনাশের আশা কি কেবলই এক মনগড়া রূপকথা? নাকি মানব ইতিহাসের পাতায় এমন কোনো সুনির্দিষ্ট ও ঐতিহাসিক নাজাতদাতা বা পরিত্রাতা এসেছেন, যিনি সত্যিই অশুভ শক্তিকে চিরতরে পরাজিত করেছেন?

আসুন, অন্ধ আবেগ ও সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে আমরা আজ সেই প্রকৃত বিজয়ীর সন্ধান করি।

১. অশুভ শক্তির আসল রূপ এবং মানুষের অসহায়তা

হিন্দু দর্শনে 'অসুর' বা ইসলামি দর্শনে 'শয়তান' বলতে যা বোঝানো হয়, তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো মানুষের ভেতরের ”গুনাহ্” বা 'পাপ'। কোনো মাটির তৈরি অস্ত্র বা জাগতিক তরবারি দিয়ে এই পাপকে বধ করা যায় না।

আমরা অনেক সময় ভাবি, আমাদের নিজেদের ভালো কাজ (পুণ্য বা আমল) দিয়ে হয়তো এই পাপকে ঢেকে ফেলা যাবে। কিন্তু পবিত্র কিতাবুল মোকাদ্দস অত্যন্ত স্পষ্টভাবে মানুষের এই অসহায়ত্ব তুলে ধরেছে:
"কারণ সবাই পাপ করেছে এবং পরমেশ্বরের মহিমা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।" (রোমীয় ৩:২৩)

পাপের কারণে মাবুদ বা পরমেশ্বরের সাথে মানুষের যে পবিত্র সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটেছে, তা কোনো বাহ্যিক উৎসব বা আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে জোড়া লাগানো সম্ভব নয়। এই আত্মিক অন্ধকারের বিনাশ করার জন্য প্রয়োজন ছিল এক স্বর্গীয় জ্যোতির।

২. মাবুদ বা পরমেশ্বরের নিখুঁত পরিকল্পনা: ত্যাগের মাধ্যমে বিজয়

প্রাচীন বৈদিক শাস্ত্রে (পুরুষ সূক্ত) উল্লেখ আছে যে, সৃষ্টির পাপ মোচনের জন্য প্রজাপতি বা পরম পুরুষকে নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে। একইভাবে, ইসলামি ঐতিহ্যে হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর পুত্রকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ একটি 'মহান কোরবানি' বা যিবহিন আজীম (সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১০৭) পাঠিয়েছিলেন।

এই উভয় দর্শনই একটি পরম সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে। পাপের অশুভ শক্তিকে ধ্বংস করতে হলে রক্তের প্রয়োজন, তবে তা কোনো সাধারণ পশু বা মানুষের রক্ত নয়। প্রয়োজন এক নিষ্কলঙ্ক ও পবিত্র বলিদানের।

আর এই অনাদি পরিকল্পনার চূড়ান্ত রূপ হিসেবেই পৃথিবীতে অবতীর্ণ হলেন ঈসা মসীহ।

৩. ঐতিহাসিক বিজয়ী: তিনি কীভাবে অশুভ শক্তিকে পরাজিত করলেন?

ঈসা মসীহ (যীশু) কোনো পৌরাণিক বা কাল্পনিক চরিত্র নন; তিনি প্রথম শতাব্দীর এক প্রামাণিক ঐতিহাসিক সত্য। তিনি অশুভ শক্তিকে ধ্বংস করতে কোনো ত্রিশূল বা তরবারি হাতে নেননি। তাঁর লড়াইয়ের পদ্ধতি ছিল মানুষের কল্পনার সম্পূর্ণ বাইরে।

কোরআন শরীফে ঈসা মসীহের অনন্য ক্ষমতার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তিনি অন্ধকে দৃষ্টি দিতেন, কুষ্ঠরোগীকে সুস্থ করতেন এবং মৃতকে জীবিত করতেন (সূরা আলে ইমরান ৩:৪৯)। এই কাজগুলো প্রমাণ করে যে, অন্ধকার, রোগ এবং মৃত্যুর মতো অশুভ শক্তির ওপর তাঁর নিরঙ্কুশ ঐশ্বরিক আধিপত্য ছিল।

কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় যুদ্ধটি হয়েছিল ক্রুশের ওপর। কিতাবুল মোকাদ্দস (বাইবেল) সাক্ষ্য দেয় যে, ঈসা মসীহ মানবজাতির সমস্ত পাপ, অভিশাপ এবং অশুভ শক্তির বিষ নিজের পবিত্র শরীরে ধারণ করেছিলেন।

ইঞ্জিল শরীফে ঈসা মসীহকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে 'পরমেশ্বরের মেষশাবক' হিসেবে:
"ঐ দেখো, ঈশ্বরের মেষশাবক, যিনি জগতের পাপ তুলে নিয়ে যান!" (ইউহোন্না ১:২৯)

শয়তান বা অশুভ শক্তি ভেবেছিল, ক্রুশে হত্যার মাধ্যমেই বুঝি ঈসা মসীহকে পরাজিত করা গেল। কিন্তু সেটিই ছিল শয়তানের সবচেয়ে বড় ভুল! ঈসা মসীহ ক্রুশে প্রাণ দিয়ে মানুষের পাপের ঋণ শোধ করলেন এবং মৃত্যুর তৃতীয় দিনে কবর থেকে জীবিত হয়ে পুনরুত্থিত হলেন।

তিনি মৃত্যুকে জয় করে 'মৃত্যুঞ্জয়ী' হিসেবে প্রমাণ করলেন যে, পৃথিবীর কোনো অশুভ শক্তি, এমনকি মৃত্যুও তাঁকে আটকে রাখতে পারে না। কিতাবুল মোকাদ্দস (বাইবেল) এই ঐতিহাসিক বিজয়ের ঘোষণা দেয় ঠিক এভাবে:
"ঈশ্বরের পুত্র (ঈসা মসীহ) এই উদ্দেশ্যেই প্রকাশিত হয়েছিলেন, যেন তিনি শয়তানের সমস্ত কাজ ধ্বংস করতে পারেন।" (১ ইউহোন্না ৩:৮)

৪. শেষ বিচার বা কিয়ামতের চূড়ান্ত বিজয়ী

হাদিস শরীফও এই সত্যের সাথে সুর মেলায়। শেষ জামানায় যখন পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বড় অশুভ শক্তি 'দাজ্জাল' চরম আকার ধারণ করবে, তখন কোনো সাধারণ মানুষ তাকে পরাজিত করতে পারবে না। সহীহ বুখারী শরীফের বর্ণনা অনুযায়ী, সেই চূড়ান্ত অশুভ শক্তিকে ধ্বংস করার জন্য এবং ন্যায়বিচারক (হাকামুন আদিল) হিসেবে আসমান থেকে যিনি নেমে আসবেন, তিনি অন্য কেউ নন, তিনি স্বয়ং ঈসা মসীহ।

অর্থাৎ, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে পরমেশ্বরের একমাত্র বিজয়ী সেনাপতি হলেন ঈসা মসীহ।

আপনার জীবনে এই বিজয়ের অর্থ কী?

প্রিয় ভাই ও বোন, আমরা উৎসবের আনন্দে মেতে উঠি, কিন্তু দিনশেষে আবার সেই পাপের অপরাধবোধ আর মৃত্যুর ভয়ে কুঁকড়ে যাই।

পরমেশ্বর আপনাকে রূপকথার কোনো কাল্পনিক আশার মধ্যে ফেলে রাখতে চাননি। ঈসা মসীহ আপনার জীবনের সমস্ত অন্ধকার ও শূন্যতা কাটাতে আজ আপনাকে ডাকছেন। তিনি বলেছেন:
"আমিই জগতের আলো; যে আমার অনুসরণ করে সে অন্ধকারের মধ্যে চলবে না, বরং জীবনের আলো পাবে।" (ইউহোন্না ৮:১২)

প্রতিমা বিসর্জনের মতো আপনার পাপের পুরনো জীবনকে আজ বিসর্জন দিন। মানুষের তৈরি আনুষ্ঠানিকতার পেছনে না ছুটে, পরমেশ্বরের সেই জীবন্ত ও ঐতিহাসিক নাজাতদাতা ঈসা মসীহের (যীশুর) ভালোবাসাকে গ্রহণ করুন।

যিনি মৃত্যুকে জয় করেছেন, তিনিই কেবল আপনাকে পাপের অশুভ শক্তি থেকে মুক্ত করে অনন্ত জীবনের পরম শান্তি দিতে পারেন।

আরো বিস্তারিত জানতে আমাদের অন্যান্য ব্লগ ও লেখাগুলোও পড়তে পারেন।

অশুভ শক্তির বিনাশ এবং নাজাতের এই পথ নিয়ে আপনার নিজস্ব কোনো ভাবনা বা প্রশ্ন আছে কি? থাকলে আমাদের লিখে অবশ্যই জানান। আমরা আপনার মতামতের গভীর মূল্যায়ন করি।