হযরত ঈসা (আ.) যদি আল্লাহ বা ঈশ্বর হন, তবে কেন বললেন, "পিতা আমার চেয়ে মহান"?

আপনি যদি কখনো কোনো খ্রীষ্টানের সাথে ধর্মতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করে থাকেন, তবে সম্ভবত এই প্রশ্নটি আপনি অবশ্যই করেছেন। একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের মনে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্নটি জাগে: "ঈসা মসীহ যদি ঈশ্বরই হবেন, তবে তিনি কেন বললেন যে পিতা তাঁর চেয়ে মহান? ঈশ্বর তো সবার চেয়ে মহান, তাঁর চেয়ে বড় তো কেউ হতে পারে না। তাহলে ঈসা মসীহ নিশ্চয়ই ঈশ্বর নন, তিনি কেবল একজন নবী!" আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রামাণিক যুক্তি মনে হয়। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই একটি বাক্যের গভীরে পরমেশ্বরের এমন এক অবাক করা ভালোবাসা লুকিয়ে আছে, যা বুঝলে আপনার হৃদয় কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠবে? আসুন, কোনো পূর্বধারণা ছাড়া, অত্যন্ত যৌক্তিকতার সাথে কোরআন, ইতিহাস, যুক্তি এবং কিতাবুল মোকাদ্দসের আলোকে এই রহস্যের গভীরে প্রবেশ করি।

আত্মিক জিজ্ঞাসা

7/21/20261 min read

প্রথমত, "মহান" বা "বড়" বলতে আসলে কী বোঝায়?

যেকোনো বাক্য বোঝার আগে আমাদের ভাষার ব্যবহারটি বুঝতে হবে। "মহান" (Greater) শব্দটি দিয়ে কি প্রকৃতি (Nature) বোঝানো হয়, নাকি পদমর্যাদা (Position) বোঝানো হয়?

একটি সাধারণ উদাহরণ দিয়ে চিন্তা করুন। দেশের প্রধানমন্ত্রী একজন সাধারণ কৃষকের চেয়ে "মহান" বা "বড়"। কিন্তু কিসের ভিত্তিতে? পদমর্যাদা, ক্ষমতা ও দায়িত্বের ভিত্তিতে। কিন্তু প্রকৃতির (Nature) দিক থেকে প্রধানমন্ত্রী এবং কৃষক—উভয়ই ১০০% মানুষ। প্রধানমন্ত্রী কৃষকের চেয়ে বেশি "মানুষ" নন।

ঠিক একইভাবে, একটি কোম্পানির মালিক (পিতা) এবং তার ম্যানেজার (পুত্র) একসাথে কাজ করছেন। পদমর্যাদায় পিতা মহান, কিন্তু মানুষ হিসেবে পিতা ও পুত্র উভয়েই সমান।

ঈসা মসীহ যখন পৃথিবীতে ছিলেন, তখন তিনি মানবীয় রূপ ও অবস্থানে ছিলেন। সেই মানবীয় অবস্থান থেকে তিনি পিতার প্রতি তাঁর পদমর্যাদাগত আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন, যা তাঁর ঐশ্বরিক প্রকৃতিকে (Divine Nature) বিন্দুমাত্র বাতিল করে না।

দ্বিতীয়ত, কোরআনের আলোকে ঈসা মসীহের অনন্য প্রকৃতি

ঈসা মসীহের প্রকৃতি বুঝতে হলে আমাদের কোরআনের দিকে তাকাতে হবে। কোরআন শরীফে ঈসা মসীহকে অত্যন্ত অনন্য দুটি উপাধি দেওয়া হয়েছে, যা অন্য কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি।

"নিশ্চয়ই মসীহ ঈসা ইবনে মরিয়ম আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর কালেমা (বাক্য), যা তিনি মরিয়মের কাছে পাঠিয়েছিলেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে আসা একটি রূহ।" (সূরা আন-নিসা ৪:১৭১)

ইসলামিক আকীদার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর "আল-ফিকহুল আকবার"-এ বলা হয়েছে, আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলী (যেমন: তাঁর কালাম বা বাক্য) সৃষ্ট নয়, বরং তা আল্লাহর মতোই অনাদি ও অনন্ত।

এখন যৌক্তিক প্রশ্ন হলো: আল্লাহর বাক্য বা কালাম কি আল্লাহ থেকে আলাদা? না। আল্লাহর বাক্য ঈশ্বরেরই অংশ। যখন সেই অনাদি "বাক্য" (কালাম) মানবদেহ ধারণ করে এই পৃথিবীতে এলেন, তখন তিনি তাঁর প্রেরক সত্তার (পিতার) কাছে পদমর্যাদাগতভাবে আনুগত্য স্বীকার করবেন, এটাই তো ঐশ্বরিক শৃঙ্খলার সবচেয়ে সুন্দর রূপ!

তৃতীয়ত, তিনি কেন নিজেকে ছোট করলেন? (ইতিহাস ও যুক্তি)

ঈসা মসীহ যখন পৃথিবীতে ছিলেন, তখন তিনি স্বর্গের সিংহাসনে বসে ছিলেন না। তিনি ছিলেন ধুলোমাখা পৃথিবীতে, একজন সাধারণ কাঠমিস্ত্রির ঘরে। তিনি ক্ষুধার্ত হয়েছেন, কেঁদেছেন, মানুষের গালি শুনেছেন।

আপনি কি মনে করেন পরমেশ্বর যদি মানব রূপ ধারণ করেন, তবে তিনি অহংকার দেখাবেন? না। সত্যিকারের মহত্ত্ব অহংকারে নয়, বরং বিনয়ে প্রকাশ পায়। ঈসা মসীহ পৃথিবীতে এসেছিলেন আমাদের শেখাতে যে কীভাবে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ অনুগত থাকতে হয়। তিনি যদি পৃথিবীতে এসে মানবীয় রূপ ধারণ করার পরও বলতেন, "আমি কারো পরোয়া করি না", তবে তিনি কি আমাদের জন্য আনুগত্যের নিখুঁত উদাহরণ হতে পারতেন?

আমাদের পাপের শাস্তি বহন করার জন্য তাঁকে একজন দাসের রূপ নিতে হয়েছিল। আর একজন দাসের অবস্থানে থেকে তিনি তাঁর প্রেরণকারী পিতার মহত্ত্ব স্বীকার করবেন, এটিই পরম সত্য।

চতুর্থত, কিতাবুল মোকাদ্দসে এই কথার আসল প্রেক্ষাপট

এবার আসুন আমরা দেখি কিতাবুল মোকাদ্দসে এই কথাটি কোন পরিস্থিতিতে বলা হয়েছে।

ঈসা মসীহ তাঁর মৃত্যুর ঠিক আগের রাতে তাঁর সাহাবীদের (শিষ্যদের) সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। তিনি বলছিলেন যে তিনি তাদের ছেড়ে পিতার কাছে ফিরে যাবেন। শিষ্যরা যখন মন খারাপ করল, তখন তিনি তাদের সান্ত্বনা দিয়ে বললেন:

"তোমরা শুনেছ, আমি তোমাদের বলেছি, 'আমি চলে যাচ্ছি এবং আবার তোমাদের কাছে আসব।' তোমরা যদি আমাকে ভালোবাসতে, তবে আমি পিতার কাছে যাচ্ছি বলে তোমরা আনন্দ করতে, কারণ পিতা আমার চেয়ে মহান।" (ইউহোন্না ১৪:২৮)

এখানে একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করুন। ঈসা মসীহ বলছেন, তিনি যেখানে ফিরে যাচ্ছেন (স্বর্গীয় পিতা), সেই স্থান ও অবস্থা তাঁর বর্তমান পার্থিব ও সীমাবদ্ধ অবস্থার চেয়ে অনেক বেশি মহিমান্বিত ও মহান। কারণ পৃথিবীতে তিনি দুঃখ, কষ্ট ও মৃত্যুর অধীন একটি মানবীয় দেহ নিয়ে ছিলেন। তিনি যখন পিতার কাছে ফিরে যাবেন, তখন তিনি তাঁর সেই আদি ঐশ্বরিক মহিমায় ফিরে যাবেন।

পঞ্চমত, প্রকৃতির দিক থেকে পিতা ও পুত্রের সমতা

ঈসা মসীহ যখন তাঁর পার্থিব দায়িত্ব বা মানবীয় অবস্থানের কথা বলেছেন, তখন তিনি পিতাকে মহান বলেছেন। কিন্তু যখন তিনি তাঁর মূল প্রকৃতি বা সত্তার (Essence) কথা বলেছেন, তখন তিনি কী বলেছেন?

কিতাবুল মোকাদ্দসে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন:
"আমি ও পিতা এক।" (ইউহোন্না ১০:৩০)

এখানে "এক" মানে উদ্দেশ্য বা কাজের দিক থেকে নয়, বরং সত্তার দিক থেকে এক।

কিতাবুল মোকাদ্দস ঈসা মসীহের এই পৃথিবীতে আসার রহস্যটি অত্যন্ত চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছে। সাহাবী হযরত পৌল (পল) লিখেছেন:

"তাঁর স্বভাব ঈশ্বরেরই স্বভাব, কিন্তু তিনি ঈশ্বরের সাথে তাঁর এই সমতা নিজের সুবিধার জন্য আঁকড়ে ধরে রাখার বিষয় বলে মনে করলেন না। বরং তিনি নিজের সেই মহিমা ছেড়ে দিলেন এবং একজন দাসের স্বভাব ধারণ করে মানুষের মতো জন্ম নিলেন। তিনি মানুষের আকার ধারণ করলেন এবং চরম বিনীত হয়ে ক্রুশীয় মৃত্যু পর্যন্ত স্বীকার করে বাধ্য রইলেন।" (ফিলিপীয় ২:৬-৮)

এই আয়াতটি সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেয়। ঈসা মসীহ স্বভাবের দিক থেকে ঈশ্বরের সমতুল্য ছিলেন। কিন্তু তিনি স্বেচ্ছায় নিজের মহিমা ত্যাগ করে দাসের রূপ নিয়েছিলেন। আর সেই দাসের রূপ বা মানবীয় অবস্থায় থেকেই তিনি বলেছিলেন, "পিতা আমার চেয়ে মহান।"

So, এই সত্য আপনার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

প্রিয় পাঠক, ঈসা মসীহ অহংকার করে স্বর্গে বসে থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি নিজেকে ছোট করেছেন, নিজেকে সীমিত করেছেন, যেন তিনি আপনার এবং আমার মতো পাপী মানুষের কাছে আসতে পারেন।

তিনি কেন নিজেকে পিতার চেয়ে পদমর্যাদায় ছোট করলেন? কারণ তিনি আপনার পাপের শাস্তি নিজের কাঁধে তুলে নিতে চেয়েছিলেন। তিনি ক্রুশে নিজের পবিত্র রক্ত দিয়ে আপনার নাজাত বা মুক্তির মূল্য পরিশোধ করতে চেয়েছিলেন।

যিনি আপনার জন্য নিজের ঐশ্বরিক মহিমা ত্যাগ করে নিজেকে এতটা ছোট করতে পারেন, তাঁর ভালোবাসা কি আপনার হৃদয়কে স্পর্শ করে না?

ঈসা মসীহ কেবল একজন নবী নন; তিনি পরমেশ্বরের সেই জীবন্ত বাক্য, যিনি আপনার মুক্তির জন্য নিজেকে রিক্ত করেছিলেন। আজ কি আপনি সেই ভালোবাসাকে গ্রহণ করবেন? আজ কি আপনি তাঁকে আপনার একমাত্র নাজাতদাতা হিসেবে আপনার হৃদয়ে স্থান দেবেন?

সত্যকে গভীরভাবে জানতে এবং আপনার জীবনের সব প্রশ্নের উত্তর পেতে নিয়মিত পড়ুন আমাদের।

এই বিষয়ে আপনার চিন্তাভাবনা বা প্রশ্ন আমাদের লিখে জানান। আমরা সম্মানের সাথে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিতে চাই।

is-Jesus-God-or-not?
is-Jesus-God-or-not?