আমরা কি সত্যিই 'এক আল্লাহকে' চিনি, নাকি কেবল একটি দূরবর্তী ধারণার ইবাদত করছি?

"বলুন, তিনি আল্লাহ, এক ও অদ্বিতীয়।" ছোটবেলা থেকেই আমরা এই আয়াতটি (সূরা আল-ইখলাস) হৃদয় দিয়ে বিশ্বাস করে আসছি। একজন মুসলিম হিসেবে 'এক আল্লাহ'-এর প্রতি আমাদের বিশ্বাস অত্যন্ত দৃঢ়। আমরা বিশ্বাস করি মাবুদ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। কিন্তু কখনো কি রাতের নিস্তব্ধতায় আপনার মনে হয়েছে, যাঁকে আমি ডাকছি, তিনি কি সত্যিই আমার ডাক শুনছেন? তিনি কি আমার খুব কাছের কেউ, নাকি কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের এক নিঃসঙ্গ, কঠোর বিচারক?

আত্মিক জিজ্ঞাসা

আল কালিমাতুল্লাহ টীম

10/14/20261 min read

আমরা কি সত্যিই 'এক আল্লাহকে' চিনি, নাকি কেবল একটি দূরবর্তী ধারণার ইবাদত করছি?
আমরা কি সত্যিই 'এক আল্লাহকে' চিনি, নাকি কেবল একটি দূরবর্তী ধারণার ইবাদত করছি?

এক আল্লাহকে বিশ্বাসের শর্ত কী? শর্ত হলো, সেই আল্লাহর ভেতরে এমন এক পূর্ণতা থাকতে হবে, যা মানুষের হৃদয়ের সমস্ত পাপ, শূন্যতা এবং দূরত্বের অবসান ঘটাতে পারে। যদি আপনার কল্পিত 'এক আল্লাহর' ধারণায় সৃষ্টিকর্তার সেই পূর্ণাঙ্গ প্রেম ও নাজাত খুঁজে পাওয়া না যায়, তবে সেই একত্ববাদের বিশ্বাস কি আপনার আত্মাকে মৃত্যুর ভয় থেকে মুক্তি দিতে পারছে?

চলুন দেখি আজকে, কোন তর্কের খাতিরে নয়, বরং ইতিহাস, কোরআন, ইসলামী আকীদা এবং কিতাবুল মোকাদ্দসের আলোকে আজ আমরা সৃষ্টিকর্তার সেই আসল পূর্ণতার সন্ধান করি।

ভালোবাসার শর্ত ও এক আল্লাহর নিঃসঙ্গতা

ইসলামী আকীদা অনুযায়ী, আল্লাহ হলেন "আল-ওয়াদুদ" (অত্যন্ত প্রেমময় বা ভালোবাসার আধার)। এখন একটি গভীর প্রশ্ন আমার সাথে সাথে আপনিও নিজেকে করুন।

ভালবাসা কি কখনো একাকি করা যায়? নাকি এর জন্য আরো কাউকে দরকার? প্রিয় বন্ধু, ভালোবাসা কখনো একা হয় না। ভালোবাসার জন্য দুজন সত্তার প্রয়োজন, একজন যিনি ভালোবাসেন এবং অন্যজন যাকে ভালোবাসা হয় অর্থাৎ, যদি সহজ কথায় বুঝি, একজন প্রেমিক প্রেমিকা। এই মহাবিশ্ব, মানুষ বা ফেরেশতা সৃষ্টির আগে যখন কিছুই ছিল না, তখন আল্লাহ কাকে ভালোবাসতেন? যদি তিনি সৃষ্টির আগে কাউকে ভালোবাসতে না পারেন, তবে তাঁর "প্রেমময়" বা "আল-ওয়াদুদ" গুণটি কি সৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেল না? কিন্তু আল্লাহ তো কারো মুখাপেক্ষী নন!

তাহলে সত্য কী? সত্য হলো, আল্লাহ কখনোই নিঃসঙ্গ বা একাকী ছিলেন না। তাঁর একত্ববাদ কোনো গাণিতিক সংখ্যা (১) নয়, তাঁর একত্ববাদ হলো এক নিখুঁত ও অনন্ত ঐক্যের প্রকাশ। আর এই ঐক্যের রহস্যটি লুকিয়ে আছে স্বয়ং আল্লাহর সত্তার ভেতরেই।

কোরআনের ইঙ্গিত: আল্লাহর বাক্য ও রূহ

কোরআন শরীফ অত্যন্ত সু-স্পষ্টভাবে এই রহস্যের একটি জানালা খুলে দিয়েছে। কোরআনে ঈসা মসীহকে অন্য কোনো নবীর মতো সাধারণ মানুষ বলা হয়নি।

সূরা আন-নিসার ১৭১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
"নিশ্চয়ই মসীহ ঈসা ইবনে মরিয়ম আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর কালেমা (বাক্য), যা তিনি মরিয়মের কাছে পাঠিয়েছিলেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে আসা একটি রূহ।"

এখানে ঈসা মসীহকে সরাসরি "কালিমাতুল্লাহ" (আল্লাহর বাক্য) এবং "রূহুল্লাহ" (আল্লাহর রূহ) বলা হয়েছে।

ইমাম আবু হানীফা (রহ.) তাঁর বিশ্বখ্যাত আকীদার কিতাব "আল-ফিকহুল আকবার"-এ স্পষ্ট লিখেছেন: "আল্লাহর কালাম (বাক্য) সৃষ্ট নয়, বরং তা অনাদি।"

একটু ভালভাবে চিন্তা করুন প্রিয় পাঠক। আল্লাহর কালাম বা বাক্য কি আল্লাহ থেকে আলাদা? না। আল্লাহর রূহ কি আল্লাহ থেকে ভিন্ন কোনো সত্তা? না। এগুলো আল্লাহর অনাদি সত্তারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। যখন বলা হয় আল্লাহ, আল্লাহর বাক্য এবং আল্লাহর রূহ, তখন কি তিনজন আলাদা মাবুদ হয়ে গেল? কখনোই না! এটি হলো সেই এক অদ্বিতীয় আল্লাহরই পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ।

কিতাবুল মোকাদ্দসের আলোতে পূর্ণাঙ্গ একত্ববাদ

কিতাবুল মোকাদ্দস (বাইবেল) আমাদেরকে এই পূর্ণাঙ্গ আল্লাহর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। কিতাবুল মোকাদ্দস শিক্ষা দেয় না যে তিনজন আলাদা ইলাহ বা মাবুদ আছেন (নাউযুবিল্লাহ)। বরং এটি শিক্ষা দেয় যে, এক অদ্বিতীয় আল্লাহ নিজেকে তিনটি উপায়ে প্রকাশ করেছেন, পিতা(আল্লাহ), পুত্র (ঈসা মসীহ) এবং পাক-রূহ (পবিত্র আত্মা)।

এটি কোনো শারীরিক বা জাগতিক পিতা-পুত্রের সম্পর্ক নয়, এটি এক নিখুঁত আত্মিক ঐক্য।

  • পিতা: যিনি সমস্ত সৃষ্টির অদৃশ্য উৎস।

  • পুত্র (ঈসা মসীহ/কালিমাতুল্লাহ): যিনি সেই অদৃশ্য আল্লাহর দৃশ্যমান প্রকাশ বা জীবন্ত বাক্য।

  • পাক-রূহ: যিনি আল্লাহর সেই পবিত্র উপস্থিতি, যা মানুষের হৃদয়ে কাজ করে।

যেমন সূর্যের মূল নক্ষত্র, তার আলো এবং তার উত্তাপ, এই তিনটি মিলে যেমন একটাই সূর্য হয়, আলো ছাড়া যেমন সূর্যের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না; ঠিক তেমনি পিতা, তাঁর বাক্য (ঈসা মসীহ) এবং তাঁর রূহ মিলে এক অদ্বিতীয় আল্লাহ।

ইঞ্জিল শরীফে ঈসা মসীহ তাই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন:
"আমি ও পিতা এক।" (ইউহোন্না ১০:৩০)
তিনি আরও বলেছেন: "যে আমাকে দেখেছে, সে পিতাকেই দেখেছে।" (ইউহোন্না ১৪:৯)

অপূর্ণ বিশ্বাসের পরিণতি: ইবলিসও এক আল্লাহকে মানে!

আপনি যদি কেবল ভাবেন যে আল্লাহ এক এবং তিনি দূর আকাশে বসে আছেন, তবে আপনার এই বিশ্বাস আপনাকে নাজাত বা মুক্তি দিতে পারবে না। কিতাবুল মোকাদ্দস একটি ভয়ংকর সত্য আমাদের সামনে তুলে ধরে:

"তুমি বিশ্বাস করো যে আল্লাহ এক। খুব ভালো কথা! কিন্তু ভূত-প্রেতরাও (শয়তান) তা বিশ্বাস করে এবং ভয়ে কাঁপে।" (ইয়াকুব ২:১৯)

শয়তানও জানে যে আল্লাহ এক। কিন্তু তাতে কি শয়তানের নাজাত হবে? না। কারণ কেবল আল্লাহ এক, এই তাত্ত্বিক জ্ঞানে কোনো মুক্তি নেই। মুক্তি বা নাজাত তখনই আসে, যখন আপনি সেই এক আল্লাহর পাঠানো নাজাতের পথকে গ্রহণ করেন।

আমাদের গুনাহের কারণে আমরা আল্লাহর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলাম। একজন নিঃসঙ্গ ও দূরবর্তী মাবুদ কেবল বিচার করতে পারেন, কিন্তু তিনি যদি আমাদের কাছে না আসেন, তবে আমরা চিরকাল জাহান্নামের অন্ধকারেই থেকে যাব।

এক আল্লাহর ভালোবাসার চূড়ান্ত প্রমাণ

আল্লাহ আমাদের দূরে ঠেলে দেননি। তিনি তাঁর অনাদি কালাম বা বাক্যকে (ঈসা মসীহকে) মানুষের রূপ দিয়ে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।

ইঞ্জিল শরীফে বলা হয়েছে:
"শুরুতে সেই কালাম (বাক্য) ছিলেন, সেই কালাম আল্লাহর সঙ্গে ছিলেন এবং সেই কালামই আল্লাহ ছিলেন। ...সেই কালামই মানুষ হয়ে জন্ম নিলেন আর অনুগ্রহ ও সত্যে পূর্ণ হয়ে আমাদের মাঝে বাস করলেন।" (ইউহোন্না ১:১ ও ১৪)

ঈসা মসীহ এই পৃথিবীতে এসে কোনো নতুন ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে আসেননি। তিনি এসেছিলেন সেই এক অদ্বিতীয় আল্লাহর ভালোবাসাকে নিখুঁতভাবে প্রমাণ করতে। আমরা আমাদের আমল বা ইবাদত দিয়ে যে পাপের ঋণ শোধ করতে পারতাম না, সেই পাপের বোঝা তিনি নিজে ক্রুশের ওপর তুলে নিয়েছিলেন। তিনি নিজের পবিত্র রক্ত দিয়ে আমাদের নাজাত কিনে নিয়েছেন।

অন্ধকারের পরপারে আলোর সন্ধান

প্রিয় ভাই ও বোন, এক আল্লাহকে মানার আসল শর্ত হলো তাঁর দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রূপ ও ভালোবাসাকে গ্রহণ করা। আপনি যদি এমন এক আল্লাহর ইবাদত করেন, যাঁকে আপনি ব্যক্তিগতভাবে চিনতে পারেন না, যাঁর কাছে গেলে আপনার নাজাতের কোনো নিশ্চয়তা নেই, তবে আজই থামুন।

পিতা, পুত্র ও পাক-রূহের এই ঐক্যের মধ্যেই রয়েছে মানুষের আত্মার চূড়ান্ত শান্তি। ঈসা মসীহ আপনার জন্য নিজের জীবন দিয়েছেন যেন আপনি সেই এক অদ্বিতীয় আল্লাহর আপন সন্তানে পরিণত হতে পারেন।

ঈসা মসীহ বলেছেন:
"আমিই পথ, আমিই সত্য এবং আমিই জীবন; আমাকে ছাড়া কেউ পিতার কাছে যেতে পারে না।" (ইউহোন্না ১৪:৬)

অনিশ্চয়তার ভয় থেকে বেরিয়ে আসুন। আজই ঈসা মসীহকে আপনার একমাত্র নাজাতদাতা হিসেবে গ্রহণ করে আল্লাহর সেই পূর্ণাঙ্গ ভালোবাসার রাজ্যে প্রবেশ করুন।

সত্যের এই অসীম সৌন্দর্য ও কিতাবুল মোকাদ্দসের গভীর শিক্ষা সম্পর্কে আরও জানতে আমাদের ওয়েবসাইটের অন্যান্য আর্টিকেলগুলো পড়তে ভুলবেন না।

আপনার মনে কি এই বিষয়গুলো নিয়ে কোনো প্রশ্ন বা চিন্তার উদয় হচ্ছে? আপনি কি এক আল্লাহর এই পূর্ণাঙ্গ রূপটি নিয়ে আরও কিছু জানতে চান? নির্দ্বিধায় আমাদের লিখে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। আমরা পরম শ্রদ্ধায় আপনার সত্য অনুসন্ধানের এই যাত্রায় পাশে আছি।