কোরআন কি সত্যিই হযরত ঈসা (আঃ) এর মৃত্যুকে অস্বীকার করে, নাকি শুধু ইহুদিদের দাবি অস্বীকার করে?
কোরআনের সূরা আন নিসা ১৫৭, সূরা আলে ইমরান ৫৫, সূরা মারইয়াম ৩৩ সহ ১৪টি আয়াতের আলোকে হযরত ঈসা (আঃ) এর মৃত্যু ও পুনরুত্থান নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ। তাওয়াফ্ফা শব্দের কোরআনিক ব্যবহার ও এর প্রকৃত অর্থ।
কোরআন গবেষণা | তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব | ঈসা মসীহের পরিচয়
Al Kalimatullah Team
10/24/20261 min read


একটি প্রশ্ন, যা হয়তো আপনি কখনো নিজেকে করেননি
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রিয় পাঠক, আপনাকে যদি এখন জিজ্ঞেস করা হয়, "হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম কি মারা গেছেন?", আপনি কী উত্তর দেবেন?
আমি প্রায় নিশ্চিত, আপনি বলবেন, "না! তিনি মারা যাননি। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জীবিত অবস্থায় আসমানে তুলে নিয়েছেন। তিনি এখনো জীবিত আছেন এবং কিয়ামতের আগে তিনি আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবেন।"
এই উত্তরটি আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি। মসজিদে শুনেছি, মাদ্রাসায় শুনেছি, ওয়াজ মাহফিলে শুনেছি, পরিবারে শুনেছি। কিন্তু একটি প্রশ্ন কি কখনো আপনার মনে জেগেছে?
আপনি কি নিজে কোরআন খুলে এই আয়াতগুলো গভীরভাবে পড়ে দেখেছেন? নাকি শুধু অন্যের মুখে শুনেই বিশ্বাস করে বসে আছেন?
আজকের এই লেখায় আমরা কোনো বানানো গল্প বলব না, কোনো মনগড়া ব্যাখ্যা দেব না। আমরা সরাসরি কোরআনুল কারীমের আয়াত, আরবি শব্দের মূল অর্থ এবং যুক্তির আলোকে এই রহস্যের গভীরে যাব। আর এই লেখার শেষে আপনি এমন কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হবেন, যার উত্তর হয়তো আপনার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যের দরজা খুলে দেবে।
তাই অনুরোধ করব, পুরো লেখাটি ধৈর্য ধরে, মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। কারণ এখানে প্রতিটি শব্দ গুরুত্বপূর্ণ।
অধ্যায় ১: সেই বিখ্যাত আয়াত, যার উপর ভিত্তি করে সবকিছু দাঁড়িয়ে আছে
অধিকাংশ মুসলিম ভাই-বোন যখন বলেন "ঈসা মসীহ মারা যাননি", তারা মূলত একটি আয়াতের উপর নির্ভর করেন। সেটি হলো সূরা আন নিসা, আয়াত ১৫৭।
আসুন, এই আয়াতটি আরবিসহ সম্পূর্ণরূপে পড়ি এবং গভীরভাবে বুঝি।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন:
وَقَوْلِهِمْ إِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِيحَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ اللَّهِ وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَٰكِن شُبِّهَ لَهُمْ
উচ্চারণ: "ওয়া কাওলিহিম ইন্না কাতালনাল মাসীহা ঈসাবনা মারইয়ামা রাসূলাল্লাহি, ওয়া মা কাতালূহু ওয়া মা সালাবূহু ওয়া লাকিন শুব্বিহা লাহুম।"
অর্থাৎ, "এবং তাদের এই দাবির কারণে যে, 'আমরা আল্লাহর রাসূল মসীহ ঈসা ইবনে মারইয়ামকে হত্যা করেছি'। অথচ তারা তাঁকে হত্যা করেনি এবং ক্রুশবিদ্ধও করেনি, কিন্তু তাদের জন্য বিষয়টি সন্দেহযুক্ত করা হয়েছিল।"
(সূরা আন নিসা, অধ্যায় ৪, আয়াত ১৫৭)
এই আয়াতটি পড়ার পর অধিকাংশ মানুষ থেমে যান এবং বলেন, "দেখলেন তো! আল্লাহ পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, ঈসা মারা যাননি।"
কিন্তু ভাই, এখানেই একটু থামুন। আয়াতটি আবার পড়ুন। এবার শব্দে শব্দে পড়ুন। কারণ এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল বোঝাবুঝি লুকিয়ে আছে।
অধ্যায় ২: আয়াতটি আসলে কী বলছে, আর আমরা কী বুঝছি?
আয়াতটি আবার লক্ষ্য করুন। আল্লাহ তায়ালা বলছেন:
"ওয়া কাওলিহিম" অর্থাৎ, "এবং তাদের এই কথার কারণে"
কাদের কথা? ইহুদিদের কথা। এই আয়াতের প্রেক্ষাপট হলো ইহুদিদের দাবি।
ইহুদিরা দাবি করেছিল, "আমরা ঈসাকে হত্যা করেছি।" তারা গর্ব করে বলেছিল, "আমরা জিতে গেছি, আমরা আল্লাহর রাসূলকে পরাজিত করেছি, আমরাই শক্তিশালী।"
আল্লাহ তায়ালা এই আয়াতে সেই দাবির জবাব দিচ্ছেন। তিনি বলছেন:
"ওয়া মা কাতালূহু" অর্থাৎ, "তারা তাঁকে হত্যা করেনি"
"ওয়া মা সালাবূহু" অর্থাৎ, "তারা তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করেনি"
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: এই আয়াতে "তারা" কারা?
"তারা" হলো ইহুদিরা।
আল্লাহ বলছেন, ইহুদিরা ঈসাকে হত্যা করেনি। ইহুদিরা ঈসাকে ক্রুশবিদ্ধ করেনি।
তাহলে এটি কি বলছে "ঈসা কখনোই মৃত্যুবরণ করেননি"?
একদমই না! আয়াতটি ইহুদিদের দাবি অস্বীকার করছে, ঈসা মসীহের মৃত্যু অস্বীকার করছে না।
এই দুটি কি একই কথা? কখনোই না।
একটি উদাহরণ দিয়ে বুঝি। ধরুন, কেউ বলল, "আমি সূর্যকে অস্ত করিয়েছি।" আপনি বললেন, "না, তুমি সূর্যকে অস্ত করোনি।" এর মানে কি এই যে সূর্য কখনো অস্ত যায়নি? না! সূর্য অস্ত যায়, কিন্তু সেটা ঐ ব্যক্তির কারণে নয়, সেটা আল্লাহর ইচ্ছায়।
ঠিক একইভাবে, ঈসা মসীহের মৃত্যু হয়েছিল, কিন্তু সেটা ইহুদিদের শক্তির কারণে নয়, সেটা ছিল স্বয়ং আল্লাহর পরিকল্পনা।
অধ্যায় ৩: "শুব্বিহা লাহুম" এর রহস্য
এবার আসুন আয়াতের সবচেয়ে রহস্যময় অংশে।
"ওয়া লাকিন শুব্বিহা লাহুম" অর্থাৎ, "কিন্তু তাদের জন্য বিষয়টি সন্দেহযুক্ত করা হয়েছিল।"
এই "শুব্বিহা লাহুম" নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাফসীরকারগণ ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
সবচেয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো: আল্লাহ অন্য একজন ব্যক্তিকে ঈসার চেহারায় রূপান্তরিত করেছিলেন এবং সেই ব্যক্তিকে ক্রুশে দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু এখানে কয়েকটি অত্যন্ত গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়:
প্রশ্ন ১: কোরআনে কি কোথাও স্পষ্ট বলা আছে যে, আল্লাহ অন্য একজনকে ঈসার চেহারায় তৈরি করেছিলেন? দয়া করে আয়াত নম্বরসহ দেখান। আপনি খুঁজে পাবেন না, কারণ কোরআনে এমন কোনো আয়াত নেই।
প্রশ্ন ২: যদি আল্লাহ সত্যিই অন্য একজন নিরপরাধ মানুষকে ঈসার চেহারায় তৈরি করে ক্রুশে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে থাকেন, তাহলে এটি কি চরম অবিচার নয়? একজন নিরপরাধ মানুষকে অন্যের অপরাধে শাস্তি দেওয়া কি ন্যায়বিচারক আল্লাহর পক্ষে সম্ভব? কোরআন নিজেই সূরা আল আনআম, আয়াত ১৬৪ তে বলছে:
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ
উচ্চারণ: "ওয়া লা তাযিরু ওয়াযিরাতুন উইযরা উখরা।"
অর্থাৎ, "কোনো বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।" (সূরা আল আনআম, অধ্যায় ৬, আয়াত ১৬৪)
তাহলে আল্লাহ কি নিজের নীতি নিজেই ভঙ্গ করবেন?
প্রশ্ন ৩: যদি অন্য কাউকে ঈসার চেহারায় ক্রুশে দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহ কি সমস্ত মানুষকে একটি বিশাল প্রতারণার মধ্যে ফেলে দিলেন? কারণ ২০০০ বছর ধরে কোটি কোটি মানুষ বিশ্বাস করেছে ঈসা ক্রুশে মারা গেছেন। আল্লাহ কি প্রতারক? আসতাকফিরূল্লাহ।
অবশ্যই না! আল্লাহ প্রতারণা করেন না।
তাহলে "শুব্বিহা লাহুম" এর সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত অর্থ কী?
সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত অর্থ হলো: ঈসা মসীহের মৃত্যুর প্রকৃত তাৎপর্য ইহুদিদের কাছে অস্পষ্ট ছিল। তারা ভেবেছিল তারা জিতে গেছে, কিন্তু আসলে তারা বুঝতে পারেনি যে এই মৃত্যু ছিল আল্লাহর মহাপরিকল্পনারই অংশ।
অধ্যায় ৪: কোরআন নিজেই যখন ঈসা মসীহের মৃত্যু স্বীকার করে
এবার আসুন এমন আয়াতগুলো দেখি, যেগুলো অধিকাংশ মুসলিম এড়িয়ে যান বা যেগুলোর অর্থ পরিবর্তন করে ব্যাখ্যা করা হয়।
আয়াত ১: সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৫৫
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন:
إِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَىٰ إِنِّي مُتَوَفِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ
উচ্চারণ: "ইয কালাল্লাহু ইয়া ঈসা ইন্নী মুতাওয়াফ্ফীকা ওয়া রাফিউকা ইলাইয়্যা।"
অর্থাৎ, "যখন আল্লাহ বললেন, হে ঈসা! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে 'তাওয়াফ্ফা' করব এবং তোমাকে আমার দিকে উঠিয়ে নেব।"
(সূরা আলে ইমরান, অধ্যায় ৩, আয়াত ৫৫)
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো "মুতাওয়াফ্ফীকা", যা এসেছে "তাওয়াফ্ফা" ধাতু থেকে।
এখন একটু আরবি শব্দতত্ত্বে যাই। কোরআনে "তাওয়াফ্ফা" শব্দটি অন্যান্য জায়গায় কী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, সেটি দেখা যাক।
প্রমাণ ১: সূরা আয যুমার, আয়াত ৪২
اللَّهُ يَتَوَفَّى الْأَنفُسَ حِينَ مَوْتِهَا
উচ্চারণ: "আল্লাহু ইয়াতাওয়াফ্ফাল আনফুসা হীনা মাওতিহা।"
অর্থাৎ, "আল্লাহ মানুষের প্রাণ হরণ করেন তাদের মৃত্যুর সময়।"
(সূরা আয যুমার, অধ্যায় ৩৯, আয়াত ৪২)
এখানে "তাওয়াফ্ফা" এর অর্থ পরিষ্কারভাবে মৃত্যু।
প্রমাণ ২: সূরা আল আনআম, আয়াত ৬১
حَتَّىٰ إِذَا جَاءَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ تَوَفَّتْهُ رُسُلُنَا
উচ্চারণ: "হাত্তা ইযা জাআ আহাদাকুমুল মাওতু তাওয়াফ্ফাতহু রুসুলুনা।"
অর্থাৎ, "অবশেষে যখন তোমাদের কারো মৃত্যু আসে, আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ তার প্রাণ হরণ করে।"
(সূরা আল আনআম, অধ্যায় ৬, আয়াত ৬১)
এখানেও "তাওয়াফ্ফা" এর অর্থ স্পষ্টভাবে মৃত্যু।
প্রমাণ ৩: সূরা আন নাহল, আয়াত ৭০
وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ ثُمَّ يَتَوَفَّاكُمْ
উচ্চারণ: "ওয়াল্লাহু খালাকাকুম সুম্মা ইয়াতাওয়াফ্ফাকুম।"
অর্থাৎ, "আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি তোমাদের মৃত্যু দেবেন।"
(সূরা আন নাহল, অধ্যায় ১৬, আয়াত ৭০)
এখানেও "তাওয়াফ্ফা" এর অর্থ মৃত্যু।
প্রমাণ ৪: সূরা আল বাকারাহ, আয়াত ২৩৪
وَالَّذِينَ يُتَوَفَّوْنَ مِنكُمْ
উচ্চারণ: "ওয়াল্লাযীনা ইউতাওয়াফ্ফাওনা মিনকুম।"
অর্থাৎ, "তোমাদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করে।"
(সূরা আল বাকারাহ, অধ্যায় ২, আয়াত ২৩৪)
এখানেও একই শব্দ, একই অর্থ: মৃত্যু।
এখন আসল প্রশ্নটি হলো যে:
কোরআনে "তাওয়াফ্ফা" শব্দটি যতবার ব্যবহৃত হয়েছে, প্রায় প্রতিবারই এর অর্থ মৃত্যু। তাহলে শুধুমাত্র ঈসা মসীহের ক্ষেত্রে এই একই শব্দের অর্থ কেন "ঘুম" বা "উঠিয়ে নেওয়া" করা হয়? এর কোরআনিক ভিত্তি কী?
যদি একই শব্দের একই ধাতুর, একই গঠনের শব্দ অন্য সব জায়গায় মৃত্যু মানে, আর শুধু ঈসা মসীহের ক্ষেত্রে ভিন্ন অর্থ করা হয়, তাহলে কি এটি কোরআনের সাথে সুবিচার হচ্ছে? নাকি আমরা আমাদের পূর্বধারণা কোরআনের উপর চাপিয়ে দিচ্ছি?
অধ্যায় ৫: স্বয়ং ঈসা মসীহ কি তাঁর মৃত্যুর কথা কোরআনে স্বীকার করেছেন?
এবার আসুন এমন একটি আয়াতে, যেখানে স্বয়ং ঈসা মসীহ কথা বলছেন। এবং তাঁর নিজের মুখের কথা শুনুন।
সূরা মারইয়াম, আয়াত ৩৩:
وَالسَّلَامُ عَلَيَّ يَوْمَ وُلِدتُّ وَيَوْمَ أَمُوتُ وَيَوْمَ أُبْعَثُ حَيًّا
উচ্চারণ: "ওয়াস সালামু আলাইয়্যা ইয়াওমা উলিদতু ওয়া ইয়াওমা আমূতু ওয়া ইয়াওমা উবআসু হাইয়্যা।"
অর্থাৎ, "এবং শান্তি আমার প্রতি, যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন আমি মৃত্যুবরণ করব, এবং যেদিন জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হব।"
(সূরা মারইয়াম, অধ্যায় ১৯, আয়াত ৩৩)
প্রিয় পাঠক, এই আয়াতটি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। কারণ এখানে স্বয়ং ঈসা মসীহ তিনটি দিনের কথা বলছেন:
প্রথম দিন: "ইয়াওমা উলিদতু" অর্থাৎ, "যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি"
এটি অতীত কাল। ঈসা মসীহ জন্মগ্রহণ করেছেন। এটি ঘটে গেছে।
দ্বিতীয় দিন: "ইয়াওমা আমূতু" অর্থাৎ, "যেদিন আমি মৃত্যুবরণ করব"
এটি ভবিষ্যৎ কাল। ঈসা মসীহ বলছেন তিনি মৃত্যুবরণ করবেন।
তৃতীয় দিন: "ইয়াওমা উবআসু হাইয়্যা" অর্থাৎ, "যেদিন জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হব"
এটিও ভবিষ্যৎ কাল। ঈসা মসীহ বলছেন তিনি জীবিত অবস্থায় উত্থিত হবেন।
এবার প্রশ্নগুলো ভাবুন:
প্রশ্ন ১: ঈসা মসীহ নিজের মুখে বলছেন "যেদিন আমি মৃত্যুবরণ করব"। তিনি যদি কখনোই মৃত্যুবরণ না করেন, তাহলে তিনি কেন এই কথা বললেন? তিনি কি ভুল বলেছেন? নাকি আমরা ভুল বুঝছি?
প্রশ্ন ২: "উবআসু" শব্দের অর্থ "পুনরুত্থিত হওয়া"। পুনরুত্থান শুধুমাত্র তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যারা আগে মৃত্যুবরণ করেছেন। আপনি কি জীবিত কাউকে "পুনরুত্থিত" বলবেন? কখনোই না। তাহলে ঈসা মসীহ যদি মারাই না গিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর "পুনরুত্থান" প্রশ্ন কেন আসছে?
প্রশ্ন ৩: আয়াতে তিনটি ঘটনার ক্রম লক্ষ্য করুন: জন্ম, তারপর মৃত্যু, তারপর পুনরুত্থান। এই ক্রম কি স্পষ্ট করে না যে, প্রথমে মৃত্যু হবে, তারপর জীবিত হয়ে ওঠা হবে?
অধ্যায় ৬: আরেকটি চমকপ্রদ আয়াত, যা অধিকাংশ মানুষ জানে না
এবার দেখুন সূরা আল মায়িদা, আয়াত ১১৭। এই আয়াতে কিয়ামতের দিনে আল্লাহ তায়ালা ঈসা মসীহকে জিজ্ঞেস করছেন। এবং ঈসা মসীহ উত্তর দিচ্ছেন:
فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنتَ أَنتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ
উচ্চারণ: "ফালাম্মা তাওয়াফ্ফাইতানী কুনতা আনতার রাক্বীবা আলাইহিম।"
অর্থাৎ, "যখন তুমি আমাকে 'তাওয়াফ্ফা' করলে, তখন তুমিই ছিলে তাদের পর্যবেক্ষক।"
(সূরা আল মায়িদা, অধ্যায় ৫, আয়াত ১১৭)
লক্ষ্য করুন! এখানে ঈসা মসীহ নিজে আল্লাহকে বলছেন, "যখন তুমি আমাকে তাওয়াফ্ফা করলে"।
আবার সেই একই শব্দ: "তাওয়াফ্ফা"।
যদি এই শব্দের অর্থ "ঘুম" বা "উঠিয়ে নেওয়া" হয়, তাহলে ঈসা মসীহ কি বলছেন, "যখন তুমি আমাকে ঘুম পাড়ালে"? এটি কি কোনো অর্থ বহন করে?
কিন্তু যদি এই শব্দের অর্থ "মৃত্যু" হয়, তাহলে পুরো আয়াতটি সুন্দরভাবে অর্থবহ হয়ে ওঠে: "যখন তুমি আমাকে মৃত্যু দিলে, তারপর তুমিই তাদের পর্যবেক্ষক ছিলে।"
অধ্যায় ৭: যুক্তির আলোকে কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন
এবার আসুন কিছু সাধারণ যুক্তির প্রশ্নে।
প্রশ্ন ১: জীবিত মানুষ কি ২০০০ বছর বাঁচতে পারে?
যদি ঈসা মসীহ শারীরিকভাবে জীবিত অবস্থায় আসমানে থাকেন, তাহলে তিনি এখন পর্যন্ত ২০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে জীবিত আছেন।
কিন্তু কোরআনে সূরা আল আম্বিয়া, আয়াত ৩৪ এ আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট বলেছেন:
وَمَا جَعَلْنَا لِبَشَرٍ مِّن قَبْلِكَ الْخُلْدَ
উচ্চারণ: "ওয়া মা জাআলনা লি বাশারিন মিন ক্বাবলিকাল খুলদ।"
অর্থাৎ, "আমি তোমার পূর্বে কোনো মানুষকেই চিরস্থায়ী জীবন দিইনি।"
(সূরা আল আম্বিয়া, অধ্যায় ২১, আয়াত ৩৪)
তাহলে এখন প্রশ্নটি হলো: আল্লাহ যদি বলেন কোনো মানুষকে চিরস্থায়ী করা হয়নি, তাহলে ঈসা মসীহ কি এই নিয়মের ব্যতিক্রম?
প্রশ্ন ২: প্রত্যেক আত্মাকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে
সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৮৫ এ আল্লাহ তায়ালা বলেন:
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ
উচ্চারণ: "কুল্লু নাফসিন যাইক্বাতুল মাওত।"
অর্থাৎ, "প্রত্যেক আত্মাকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।"
(সূরা আলে ইমরান, অধ্যায় ৩, আয়াত ১৮৫)
"কুল্লু নাফসিন" অর্থাৎ প্রত্যেক আত্মা, কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই।
তাহলে এখন প্রশ্ন হলো: ঈসা মসীহ কি এই "কুল্লু" (প্রত্যেক) এর মধ্যে পড়েন, নাকি তিনি এর বাইরে?
প্রশ্ন ৩: যদি পরে মারা যাবেনই, তাহলে "মারা যাননি" দাবি কতটুকু সঠিক?
অনেকে বলেন, ঈসা মসীহ পরে ফিরে এসে মৃত্যুবরণ করবেন। ঠিক আছে, তাহলে তিনি একবার তো মৃত্যুবরণ করবেনই। তাহলে "তিনি কখনো মারা যাননি" এই দাবি এমনিতেই ভুল প্রমাণিত হয়, কারণ ভবিষ্যতে হলেও তিনি মারা যাবেন।
কিন্তু কোরআন ও হাদিস দুটোই বলছে, তিনি ফিরে এসে দাজ্জালকে পরাজিত করবেন এবং তারপর মৃত্যুবরণ করবেন। তাহলে প্রশ্ন হলো, তিনি কি দুবার মারা যাবেন? নাকি একবারই, যেটি ইতিমধ্যে হয়ে গেছে?
অধ্যায় ৮: তাহলে আসল সত্যটা কী?
এই পর্যন্ত আমরা যা দেখলাম, সেটি একটু সংক্ষেপে সাজাই:
১. সূরা আন নিসা ১৫৭ বলছে: ইহুদিরা ঈসাকে হত্যা করেনি। এটি ইহুদিদের দাবির জবাব, ঈসার মৃত্যুর অস্বীকার নয়।
২. সূরা আলে ইমরান ৫৫ বলছে: আল্লাহ ঈসাকে "তাওয়াফ্ফা" করেছেন। এই শব্দ কোরআনের অন্যত্র সর্বদা মৃত্যুর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
৩. সূরা মারইয়াম ৩৩ এ স্বয়ং ঈসা মসীহ বলছেন: তিনি মৃত্যুবরণ করবেন এবং পুনরুত্থিত হবেন।
৪. সূরা আল মায়িদা ১১৭ এ ঈসা মসীহ আল্লাহকে বলছেন: "যখন তুমি আমাকে তাওয়াফ্ফা করলে।"
৫. সূরা আল আম্বিয়া ৩৪ বলছে: কোনো মানুষকে চিরস্থায়ী করা হয়নি।
৬. সূরা আলে ইমরান ১৮৫ বলছে: প্রত্যেক আত্মাকে মৃত্যুর স্বাদ পেতেই হবে।
এই ছয়টি আয়াত একসাথে পড়লে কী চিত্র ফুটে ওঠে?
ঈসা মসীহ মৃত্যুবরণ করেছিলেন, কিন্তু সেটা ইহুদিদের বিজয় ছিল না, সেটা ছিল আল্লাহর পরিকল্পনা। তিনি মৃত্যুর পর পুনরুত্থিত হয়েছিলেন। এবং এরপর আল্লাহ তাঁকে নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছিলেন।
মৃত্যু ছিল, কিন্তু পরাজয় ছিল না।
মৃত্যু ছিল, কিন্তু শেষ ছিল না।
এতোগুলো প্রমান দেখার পরেও কি বলবেন যে, তিনি মৃত্যুবরণ করেন নি, শুধুমাত্র তাফসিরকারকদের ব্যাখ্যা দেখে? তার মানে কি, আপনি কোরআনের নিজস্ব আয়াতের প্রমাণ থেকেও তাফসিরকারকদের কথায় বেশি বিশ্বাস করেন? নিজেকে বারবার প্রশ্ন করুন, উত্তরটি পেয়ে যাবেন ইনশাল্লাহ্।
অধ্যায় ৯: তাহলে পূর্ণ ঘটনাটি কোথায় পাব?
প্রিয় পাঠক, কোরআনুল কারীম এই ঘটনার সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিত দিয়েছে। কিন্তু পূর্ণ বিবরণ কোথায় আছে?
স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা উত্তর দিচ্ছেন।
সূরা আল মায়িদা, আয়াত ৪৬:
وَآتَيْنَاهُ الْإِنجِيلَ فِيهِ هُدًى وَنُورٌ
উচ্চারণ: "ওয়া আতাইনাহুল ইনজীলা ফীহি হুদান ওয়া নূর।"
অর্থাৎ, "আমরা তাঁকে ইঞ্জিল প্রদান করেছিলাম, যাতে হেদায়েত ও নূর রয়েছে।"
(সূরা আল মায়িদা, অধ্যায় ৫, আয়াত ৪৬)
আল্লাহ তায়ালা নিজে বলছেন, ইঞ্জিলে হেদায়েত ও নূর আছে।
এরপর সূরা ইউনুস, আয়াত ৯৪:
فَإِن كُنتَ فِي شَكٍّ مِّمَّا أَنزَلْنَا إِلَيْكَ فَاسْأَلِ الَّذِينَ يَقْرَءُونَ الْكِتَابَ مِن قَبْلِكَ
উচ্চারণ: "ফা ইন কুনতা ফী শাক্কিন মিম্মা আনযালনা ইলাইকা, ফাসআলিল্লাযীনা ইয়াক্বরাউনাল কিতাবা মিন ক্বাবলিকা।"
অর্থাৎ, "তুমি যদি আমার অবতীর্ণ করা বিষয়ে সন্দেহে থাকো, তাহলে তাদের জিজ্ঞেস করো যারা তোমার আগে থেকে কিতাব পড়ছে।"
(সূরা ইউনুস, অধ্যায় ১০, আয়াত ৯৪)
স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা আদেশ দিচ্ছেন: সন্দেহ হলে পূর্ববর্তী কিতাব পড়ো, তাদের জিজ্ঞেস করো।
ভাই, আপনি কি কখনো ইঞ্জিল শরিফ হাতে নিয়ে পড়ে দেখেছেন?
ইঞ্জিল শরিফে ঈসা মসীহের মৃত্যু, পুনরুত্থান এবং আসমানে যাওয়ার সম্পূর্ণ বিবরণ আছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনাসহ, এমন বিস্তারিত বিবরণ যা কোরআনে সংক্ষেপে ইঙ্গিত করা হয়েছে কিন্তু পূর্ণরূপে বলা হয়নি।
অধ্যায় ১০: চূড়ান্ত প্রশ্ন
প্রিয় পাঠক, আজ আমি আমার বিশ্বাস আপনাকে জোর করে চাপিয়ে দিচ্ছি না। আমি শুধু কোরআনের আয়াত আপনার সামনে উপস্থাপন করেছি এবং কিছু প্রশ্ন রেখে যাচ্ছি আপনার হৃদয়ে।
প্রশ্ন ১: কোরআন যদি ইঞ্জিলকে "হেদায়েত ও নূর" বলে, তাহলে সেই নূর থেকে আপনি কেন বঞ্চিত থাকবেন?
প্রশ্ন ২: কোরআনের একই শব্দ "তাওয়াফ্ফা" যখন অন্য সব ক্ষেত্রে মৃত্যু মানে, তখন শুধু ঈসা মসীহের ক্ষেত্রে এর অর্থ পরিবর্তন করা কি ন্যায়সঙ্গত?
প্রশ্ন ৩: ঈসা মসীহ নিজে যখন বলছেন "আমি মৃত্যুবরণ করব ও পুনরুত্থিত হব", তাহলে আমরা কেন বলছি তিনি মারা যাননি?
প্রশ্ন ৪: আল্লাহ যদি স্বয়ং বলেন "সন্দেহ হলে পড়ো, জিজ্ঞেস করো", আর আপনি না পড়েন, না জিজ্ঞেস করেন, তাহলে কি আল্লাহর আদেশ পালন হচ্ছে?
প্রশ্ন ৫: আপনি কি নিজের ঈমানের ভিত্তি অন্যের মুখে শোনা কথার উপর রাখবেন, নাকি নিজে গবেষণা করে সত্য খুঁজে বের করবেন?
আমার আহ্বান
ভাই, সত্য জানার জন্য সাহস লাগে। কিন্তু সত্য থেকে পালানো আরও কঠিন, কারণ সত্য কখনো চুপ থাকে না।
আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং কোরআনে বলেছেন:
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ
উচ্চারণ: "ইন্নামা ইয়াখশাল্লাহা মিন ইবাদিহিল উলামা।"
অর্থাৎ, "নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে শুধু জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে।"
(সূরা ফাতির, অধ্যায় ৩৫, আয়াত ২৮)
জ্ঞানী হোন। সত্য সন্ধান করুন। ইঞ্জিল শরিফ পড়ুন। এরপর সিদ্ধান্ত আপনার।
ইঞ্জিল শরিফ পড়তে এবং এই রহস্যের পূর্ণ উত্তর জানতে আমাদের এই ওয়েবসাইট এর অন্যান্য বিষয়গুলোও ভিজিট করুন, ইনশাল্লাহ নিরাশ হবেন না।
আপনার মতামত জানান
এই লেখা পড়ে আপনার মনে কী প্রশ্ন জেগেছে? কোনো আয়াত নিয়ে আপনার কি দ্বিমত আছে? নাকি নতুন কিছু জানলেন?
আপনার মতামত লিখে জানাতে পারেন। আমরা কোরআন ও হাদিসের আলোকে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।
এই লেখাটি যদি একটুও চিন্তার খোরাক দিয়ে থাকে, তাহলে শেয়ার করুন আপনার প্রিয় মানুষদের সাথে। হয়তো আপনার একটি শেয়ার কারো জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যের দরজা খুলে দেবে। এটি হবে আপনার জন্য এক অনন্য সাদাকাহ জারিয়া।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সত্য জানার, সত্য বোঝার এবং সত্যের পথে চলার তৌফিক দান করুন। আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।
হোম-ব্লগ ও প্রবন্ধ-প্রশ্নোত্তর-সম্পদ-যোগাযোগ
যোগাযোগ
salam@alkalimatullah.org
গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা সম্পূর্ণ নিশ্চিত
© 2026 কালিমাতুল্লাহ-ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক সত্য অনুসন্ধান কেন্দ্র।
সত্য অনুসন্ধান করুন, কারণ সত্য আপনাকে মুক্ত করবে।
