কোরআনে ঈসা মসীহকে কেন "আল্লাহর রূহ" বলা হয়েছে?
এটি এমন একটি উপাধি যা শুনলে হৃদয় কেঁপে ওঠে
আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে একমাত্র ঈসা মসীহকেই কেন "রূহুন মিনহু" অর্থাৎ "আল্লাহর পক্ষ থেকে রূহ" বলা হয়েছে?
আল্লাহ তায়ালা কোরআনে হাজার হাজার সৃষ্টির কথা উল্লেখ করেছেন। ফেরেশতা, জিন, মানুষ, নবী, রাসূল। কিন্তু তাঁদের কাউকেই তিনি বলেননি "আমার রূহ" বা "আমার পক্ষ থেকে রূহ।"
শুধুমাত্র একজনকে এই উপাধি দেওয়া হয়েছে।
শুধুমাত্র ঈসা ইবনে মরিয়মকে।
এখন প্রশ্ন হলো, কেন?
কেন আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিজের রূহ দিয়ে ঈসাকে সৃষ্টি করলেন? এই "রূহ" কী? এটি কি একটি ফেরেশতা, নাকি কিছু অন্য? এবং যদি ঈসার মধ্যে আল্লাহর রূহ থাকে, তাহলে ঈসার পরিচয় আসলে কী?
আজকের লেখায় আমরা কোরআন, হাদিস, তাফসির এবং বাইবেলের আলোকে এই গভীর রহস্যের উত্তর খুঁজব। এই লেখাটি শেষ পর্যন্ত পড়লে আপনার ঈসা মসীহ সম্পর্কে ধারণা সম্পূর্ণভাবে বদলে যাবে। হয়তো আপনার চোখে পানি চলে আসবে। হয়তো আপনার হৃদয় এমন একটি সত্যের সামনে দাঁড়াবে যা আপনি কখনো কল্পনা করেননি।
চলুন শুরু করি।
📖 কোরআনে কোথায় ঈসাকে "আল্লাহর রূহ" বলা হয়েছে?
কোরআনে দুটি স্থানে স্পষ্টভাবে ঈসাকে "রূহুন মিনহু" বা "আল্লাহর পক্ষ থেকে রূহ" বলা হয়েছে। এবং আরও একটি সূরায় পরোক্ষভাবে এই সত্যের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
প্রথম আয়াত: সূরা আন নিসা ৪:১৭১
আরবি পাঠ:
إِنَّمَا الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ رَسُولُ اللَّهِ وَكَلِمَتُهُ أَلْقَاهَا إِلَىٰ مَرْيَمَ وَرُوحٌ مِنْهُ
বাংলা অনুবাদ:
"মসীহ ঈসা ইবনে মরিয়ম তো কেবলমাত্র আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর কালেমা, যা তিনি মরিয়মের প্রতি প্রেরণ করেছেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে একটি রূহ।"
এই আয়াতে তিনটি অসাধারণ উপাধি একসাথে এসেছে: (যা আমরা ১ম প্রশ্নেও আলোচনা করেছি)
১. রাসূলুল্লাহ (আল্লাহর রাসূল)
২. কালিমাতুহু (আল্লাহর কালেমা)
৩. রূহুন মিনহু (আল্লাহর পক্ষ থেকে রূহ)
এই আয়াতে লক্ষ্য করুন "মিনহু" (مِنْهُ) শব্দটি। এর অর্থ "তাঁর থেকে" বা "তাঁর পক্ষ থেকে।" অর্থাৎ, এই রূহ আল্লাহর নিজের থেকে এসেছে। আল্লাহর সত্তা থেকে উৎসারিত।\
দ্বিতীয় আয়াত: সূরা আল আম্বিয়া ২১:৯১
আরবি পাঠ:
وَالَّتِي أَحْصَنَتْ فَرْجَهَا فَنَفَخْنَا فِيهَا مِن رُّوحِنَا
বাংলা অনুবাদ:
"এবং সেই নারী যে তার সতীত্ব রক্ষা করেছিল, তখন আমি তার মধ্যে আমার রূহ থেকে ফুঁক দিয়েছিলাম।"
এখানে "মিন রূহিনা" (مِن رُّوحِنَا) মানে "আমার রূহ থেকে।" আল্লাহ বলছেন তিনি মরিয়মের মধ্যে তাঁর নিজের রূহ ফুঁক দিয়েছেন। এবং সেই রূহ থেকেই ঈসার জন্ম।
তৃতীয় আয়াত: সূরা আত তাহরীম ৬৬:১২
আরবি পাঠ:
وَمَرْيَمَ ابْنَتَ عِمْرَانَ الَّتِي أَحْصَنَتْ فَرْجَهَا فَنَفَخْنَا فِيهِ مِن رُّوحِنَا
বাংলা অনুবাদ:
"এবং ইমরানের কন্যা মরিয়ম, যে তার সতীত্ব রক্ষা করেছিল, তখন আমি তার মধ্যে আমার রূহ থেকে ফুঁক দিয়েছিলাম।"
আবারও একই শব্দ: "মিন রূহিনা" অর্থাৎ "আমার রূহ থেকে।"
তিনটি আয়াতেই পরিষ্কার: ঈসা মসীহ সৃষ্টি হয়েছেন আল্লাহর নিজের রূহ থেকে।
🔍 "রূহ" শব্দের আরবি অর্থ কী?
আরবি ভাষায় "রূহ" (رُوح) শব্দটির মূল অর্থ হলো "প্রাণ," "আত্মা," বা "আধ্যাত্মিক শক্তি।"
আরবি ভাষার সবচেয়ে বড় অভিধান "লিসানুল আরব" এবং "তাজুল আরূস" গ্রন্থে "রূহ" শব্দের অর্থ দেওয়া হয়েছে:
الرُّوحُ: النَّفْسُ، الحَيَاةُ، القُوَّةُ الإِلَهِيَّةُ
অর্থাৎ: "রূহ মানে আত্মা, জীবন, ঐশ্বরিক শক্তি।"
কিন্তু এই শব্দটি যখন "মিন রূহিনা" অর্থাৎ "আমার রূহ থেকে" বাক্যে ব্যবহৃত হয়, তখন এর অর্থ আরও গভীর হয়ে যায়। এটি শুধু "প্রাণ" নয়, এটি আল্লাহর নিজের সত্তার একটি অংশ।
কোরআনে "রূহ" শব্দের বিভিন্ন ব্যবহার
কোরআনে "রূহ" শব্দটি কয়েকটি ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে:
১. রূহুল কুদ্দুস (পবিত্র রূহ): জিব্রাইল ফেরেশতাকে বোঝাতে (সূরা বাকারা ২:৮৭, ২৫৩; সূরা নাহল ১৬:১০২)
২. রূহুল আমীন (বিশ্বস্ত রূহ): জিব্রাইল ফেরেশতাকে বোঝাতে (সূরা শুআরা ২৬:১৯৩)
৩. রূহুন মিন আমরিহি (তাঁর আদেশ থেকে রূহ): ওহী বা আল্লাহর নির্দেশ বোঝাতে (সূরা মুমিন ৪০:১৫)
৪. রূহুন মিনহু (তাঁর পক্ষ থেকে রূহ): শুধুমাত্র ঈসা মসীহের ক্ষেত্রে (সূরা নিসা ৪:১৭১)
লক্ষ্য করুন, অন্যান্য ক্ষেত্রে "রূহ" শব্দটি ফেরেশতা বা ওহীকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু ঈসার ক্ষেত্রে শব্দটি হলো "মিনহু" অর্থাৎ "তাঁর থেকে।"
এটি কেবল একটি ফেরেশতা নয়। এটি কেবল একটি ওহী নয়। এটি আল্লাহর নিজের রূহ।
📚 ইসলামী তাফসিরকারকরা কী বলেছেন?
১. ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) এর তাফসির:
ইমাম ইবনে কাসীর তাঁর বিখ্যাত তাফসিরে সূরা নিসা ৪:১৭১ এর ব্যাখ্যায় লিখেছেন:
"ঈসাকে 'রূহুন মিনহু' বলার কারণ হলো, তিনি আল্লাহর নিজের রূহ থেকে সৃষ্টি হয়েছেন, যা জিব্রাইলের মাধ্যমে মরিয়মের মধ্যে ফুঁকে দেওয়া হয়েছিল।" (তাফসীর ইবনে কাসীর, খণ্ড ২, সূরা নিসা ৪:১৭১)
কিন্তু এখানে আবার একই প্রশ্ন আসে: আল্লাহ তো আদমের মধ্যেও রূহ ফুঁকেছিলেন। সূরা সাদ ৩৮:৭২ এ আল্লাহ বলেছেন:
فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِن رُّوحِي
অর্থাৎ, "অতঃপর যখন আমি তাকে সুষম করব এবং তার মধ্যে আমার রূহ থেকে ফুঁক দেব।"
তাহলে আদমকেও তো "রূহুন মিনহু" বলা যেত। কিন্তু বলা হয়নি। কেন?
২. ইমাম ফখরুদ্দিন রাযী (রহ.) এর তাফসির:
ইমাম রাযী তাঁর "তাফসীরে কবির" গ্রন্থে এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন:
"আদমের ক্ষেত্রে আল্লাহ বলেছেন 'আমি তার মধ্যে আমার রূহ থেকে ফুঁক দেব' কিন্তু আদমকে 'রূহ' বলা হয়নি। ঈসার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে 'রূহুন মিনহু' অর্থাৎ তিনি নিজেই সেই রূহ। আদম রূহ পেয়েছেন, কিন্তু ঈসা নিজেই রূহ।" (তাফসীরে কবির, ইমাম ফখরুদ্দিন রাযী, খণ্ড ১১, সূরা নিসা ৪:১৭১)
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য।
আদম রূহ পেয়েছেন।
ঈসা নিজেই রূহ।
আদম মাটি থেকে সৃষ্ট একটি দেহ, যার মধ্যে আল্লাহ রূহ ফুঁকেছেন।
ঈসা নিজেই সেই রূহ, যিনি মরিয়মের গর্ভে মানুষের রূপ ধারণ করেছেন।
৩. ইমাম কুরতুবী (রহ.) এর তাফসির:
ইমাম কুরতুবী লিখেছেন: "ঈসাকে 'রূহ' বলার কারণ হলো, তিনি মানুষের জীবন দান করতেন। মৃতকে জীবিত করতেন। এই ক্ষমতা আল্লাহ ছাড়া আর কারোর নেই। তাই ঈসা আল্লাহর রূহের প্রকাশ।" (তাফসীর আল কুরতুবী, খণ্ড ৫, সূরা নিসা ৪:১৭১)
৪. ইমাম তাবারী (রহ.) এর তাফসির:
ইমাম তাবারী লিখেছেন: "আল্লাহ বলেছেন 'রূহুন মিনহু' অর্থাৎ এই রূহ আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে এবং এই রূহ ঈসার মধ্যে এমনভাবে প্রকাশিত হয়েছে যে ঈসা নিজেই সেই রূহের জীবন্ত রূপ হয়ে উঠেছেন।" (তাফসীর আত তাবারী, খণ্ড ৮, সূরা নিসা ৪:১৭১)
🔗 হাদিসে "রূহুন মিনহু" এর প্রমাণ
হাদিসেও ঈসাকে "রূহুল্লাহ" বা "আল্লাহর রূহ" বলা হয়েছে।
সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৩৪৩৫;
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরীক নেই, এবং মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসূল, এবং ঈসা আল্লাহর বান্দা ও রাসূল এবং তাঁর কালেমা যা তিনি মরিয়মের কাছে প্রেরণ করেছেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে একটি রূহ, এবং জান্নাত সত্য এবং জাহান্নাম সত্য, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, তার আমল যাই হোক না কেন।"
এই হাদিসে মুহাম্মদ (সা.) নিজে বলেছেন ঈসা "রূহুন মিনহু" অর্থাৎ "আল্লাহর পক্ষ থেকে রূহ।" এবং তিনি বলেছেন এই সাক্ষ্য দিলে জান্নাত নিশ্চিত।
সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৮;
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "কিয়ামতের দিন মানুষ আদমের কাছে যাবে, তিনি বলবেন 'আজ আমার কথা নয়।' তারপর মূসার কাছে যাবে, তিনি বলবেন 'আজ আমার কথা নয়।' তারপর ঈসার কাছে যাবে, তিনি বলবেন 'আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল এবং তাঁর কালেমা ও রূহ, কিন্তু তোমরা মুহাম্মদের কাছে যাও।'"
এই হাদিসে ঈসা নিজে নিজেকে "আল্লাহর কালেমা ও রূহ" বলে পরিচয় দিচ্ছেন।
💡 "আল্লাহর রূহ" মানে কি আল্লাহর অংশ?
এখন একটি গভীর প্রশ্ন আসে: যদি ঈসা "আল্লাহর রূহ" হন, তাহলে কি ঈসা আল্লাহর অংশ?
কোরআন বলে:
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ اللَّهُ الصَّمَدُ لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ
অর্থাৎ, "বলো, তিনি আল্লাহ, এক। আল্লাহ, অমুখাপেক্ষী। তিনি জন্ম দেননি এবং জন্ম নেননি। এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।" (সূরা ইখলাস ১১২:১-৪)
তাহলে ঈসা কিভাবে "আল্লাহর রূহ" হতে পারেন?
এই প্রশ্নের উত্তর বুঝতে হলে আমাদের বুঝতে হবে "রূহ" মানে কি, সত্তাগত অংশ নাকি গুণগত প্রকাশ।
আসুন, উদাহরণ দিয়ে বুঝার চেষ্টা করিঃ-
ধরুন, আপনার একটি কথা মনে জমা আছে। এখন সেই কথাটি আপনার মন থেকে বের হয়ে আপনার মুখ দিয়ে প্রকাশিত হলো। এখন সেই কথা কি আপনার অংশ নাকি আপনার প্রকাশ?
একইভাবে, আপনার একটি শ্বাস আছে। সেই শ্বাস আপনার ফুসফুস থেকে বের হয়ে বাতাসে মিশে যায়। এখন সেই শ্বাস কি আপনার অংশ নাকি আপনার প্রকাশ?
আল্লাহর রূহও তেমন। এটি আল্লাহর সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো অংশ নয়। এটি আল্লাহর গুণ, আল্লাহর ক্ষমতা, আল্লাহর জীবনদানের শক্তির প্রকাশ। এবং ঈসা মসীহ হলেন সেই প্রকাশেরই মূর্ত রূপ।
আদম ও ঈসার মধ্যে পার্থক্য: তবে কেন আদমকে "রূহ" বলা হয়নি?
কোরআনে আদম সম্পর্কে বলা হয়েছে:
فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِن رُّوحِي فَقَعُوا لَهُ سَاجِدِينَ
অর্থাৎ, "অতঃপর যখন আমি তাকে সুষম করব এবং তার মধ্যে আমার রূহ ফুঁকে দেব, তখন তোমরা তার সামনে সেজদায় পড়ো।" (সূরা সাদ ৩৮:৭২)
এখানে আল্লাহ বলেছেন "আমার রূহ ফুঁকে দেব" কিন্তু আদমকে "রূহ" বলা হয়নি।
কিন্তু ঈসার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে "রূহুন মিনহু" অর্থাৎ ঈসা নিজেই সেই রূহ।
পার্থক্যটি এরকম:
টেবিলের ক্রমানুসারে বিবেচ্য: আদম > ঈসা
| মাটি থেকে সৃষ্ট দেহ > রূহ থেকে সৃষ্ট সত্তা
| রূহ পেয়েছেন (ফুঁক দেওয়া হয়েছে) > নিজেই রূহ
| মাটি + রূহ = আদম > রূহ = ঈসা
| মাটিতে ফিরে যাবেন (মৃত্যু) > রূহ হিসেবে চিরজীবী
| আল্লাহর সৃষ্টি > আল্লাহর রূহের প্রকাশ
প্রিয় পাঠক, এই পার্থক্যটি বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদম একটি দেহ যার মধ্যে রূহ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঈসা নিজেই সেই রূহ, যিনি মানুষের রূপ ধারণ করেছেন।
✝️ বাইবেলে "আল্লাহর রূহ" সম্পর্কে কী বলা আছে?
এখন দেখি খ্রীষ্টানদের বাইবেল এই বিষয়ে কী বলে। কারণ কোরআনও নিজেই বলে:
"তাওরাত ও ইঞ্জিলের অনুসারীরা, তোমাদের কাছে যে কিতাব আছে তা দিয়ে বিচার করো।" (সূরা মায়েদা ৫:৪৭)
লূক পুস্তক ১:৩৫
ফেরেশতা জিব্রাইল মরিয়মকে বলেছেন: "পবিত্র আত্মা (পাক-রূহ্) তোমার উপরে আসবেন এবং সর্বশক্তিমানের শক্তি তোমার উপরে ছায়া করবে; এই কারণ যে পবিত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবেন, তাঁকে ইবনুল্লাহ্ (আল্লাহর পুত্র) বলা হবে।"
এখানে "পবিত্র আত্মা বা পাক-রূহ্" শব্দটি গ্রিক ভাষায় "পনিউমা হাগিওন" (Πνεῦμα Ἅγιον) এবং আরবিতে "রূহুল কুদ্দুস।"
মথি পুস্তক ১:১৮
"মরিয়মের গর্ভে যা সৃষ্টি হয়েছে তা পবিত্র আত্মা বা পাক-রুহ্ থেকে।"
যোহন পুস্তক ১:৩২-৩৪
আর বাপ্তিস্মদাতা ইয়াহিয়া সাক্ষ্য দিয়ে বলেছিলেনঃ আমি পাক-রূহ্কে কবুতরের মত বেহেশত থেকে নামতে দেখেছি; তিনি তাঁর উপরে অবস্থিতি করলেন। আর আমি তাঁকে চিনতাম না, কিন্তু যিনি আমাকে পানিতে বাপ্তিস্ম দিতে পাঠিয়েছেন, তিনিই আমাকে বললেন, যাঁর উপরে রূহ্কে নেমে অবস্থিতি করতে দেখবে, তিনিই সেই ব্যক্তি, যিনি পাক-রূহে বাপ্তিস্ম দেন। আর আমি দেখেছি ও সাক্ষ্য দিয়েছি যে, ইনিই আল্লাহ্র পুত্র।
কোরআন ও বাইবেলের মিল
টেবিলের ক্রমানুসারে বিবেচ্য: বিষয় > কোরআন > বাইবেল
| ঈসার জন্ম কিভাবে? > আল্লাহর রূহ থেকে (সূরা তাহরীম ৬৬:১২) > পবিত্র আত্মা থেকে (লূক ১:৩৫)
| ঈসার পরিচয়? > রূহুন মিনহু (সূরা নিসা ৪:১৭১) > পাক-রুহে্ পূর্ণ (যোহন ১:৩২)
| রূহ কার? > আল্লাহর রূহ > আল্লাহর পাক-রুহ্
| রূহ কি করে? > জীবন দেয় > জীবন দেয়
🕊️ রূহুল কুদ্দুস (পবিত্র রূহ) ও ঈসার সম্পর্ক
কোরআনে "রূহুল কুদ্দুস" বা "পাক-রূহ" শব্দটি কয়েকবার এসেছে। এবং প্রতিবারই এটি ঈসা মসীহের সাথে যুক্ত।
সূরা বাকারা ২:৮৭
وَآتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَاتِ وَأَيَّدْنَاهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ
অর্থাৎ, "এবং আমি ঈসা ইবনে মরিয়মকে স্পষ্ট নিদর্শন দিয়েছি এবং তাঁকে রূহুল কুদ্দুস (পবিত্র রূহ) দিয়ে শক্তিশালী করেছি।"
সূরা বাকারা ২:২৫৩
تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ... وَآتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَاتِ وَأَيَّدْنَاهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ
অর্থাৎ, "এই সমস্ত রাসূলদের মধ্যে আমি কাউকে কারো ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি... এবং ঈসা ইবনে মরিয়মকে স্পষ্ট নিদর্শন দিয়েছি এবং তাঁকে রূহুল কুদ্দুস দিয়ে শক্তিশালী করেছি।"
সূরা মায়েদা ৫:১১০
إِذْ أَيَّدتُّكَ بِرُوحِ الْقُدُسِ
অর্থাৎ, "যখন আমি তোমাকে রূহুল কুদ্দুস দিয়ে শক্তিশালী করেছি।"
লক্ষ্য করুন, কোরআনে যতবার "রূহুল কুদ্দুস" শব্দ এসেছে, তা শুধু ঈসা মসীহের সাথে যুক্ত। অন্য কোনো নবীর জন্য এই শব্দ ব্যবহৃত হয়নি।
🔥 ঈসা মসীহ কেন মৃতকে জীবিত করতে পারতেন?
এখন চিন্তা করুন, কোরআন বলছে ঈসা মৃতকে জীবিত করতে পারতেন। সূরা আল ইমরান ৩:৪৯ এ আল্লাহ ঈসার মুখ দিয়ে বলিয়েছেন:
وَأُحْيِي الْمَوْتَىٰ بِإِذْنِ اللَّهِ
অর্থাৎ, "এবং আল্লাহর অনুমতিতে আমি মৃতকে জীবিত করি।"
প্রশ্ন হলো, কিভাবে?
কোনো নবী কি মৃত্যুকে জয় করতে পারেন? কোনো সৃষ্ট প্রাণী কি মৃত্যুকে পরাজিত করতে পারে?
কিন্তু ঈসা পেরেছিলেন। কারণ তিনি "রূহুন মিনহু" অর্থাৎ আল্লাহর রূহ। আর আল্লাহর রূহ মানেই জীবন। যেখানে আল্লাহর রূহ, সেখানে মৃত্যু নেই।
এজন্যই ঈসা বলতে পেরেছিলেন: "আমিই পুনরুত্থান এবং জীবন। যে আমার উপর ঈমান আনে, সে মরে গেলেও বাঁচবে।" (যোহন ১১:২৫)
💭 একটি গভীর প্রশ্ন: রূহ কি মরতে পারে?
এখন আসুন এই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে ভাবি।
ঈসা যদি "রূহুন মিনহু" অর্থাৎ আল্লাহর রূহ হন, তাহলে তিনি কি মরতে পারেন?
রূহ কি মরে?
কোরআনে আল্লাহ বলেছেন:
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ
অর্থাৎ, "প্রতিটি প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।" (সূরা আল ইমরান ৩:১৮৫)
কিন্তু এখানে "নাফস" (نَفْسٍ) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ "প্রাণী" বা "দেহধারী সত্তা।"
কিন্তু "রূহ" কি "নাফস" এর মতো? উত্তর হলো: না।
রূহ হলো আত্মা, যা কখনো মরে না। ইসলামী আকিদা অনুযায়ী, মানুষের দেহ মরে কিন্তু রূহ বেঁচে থাকে। এজন্যই কবরের সওয়াল-জওয়াব হয়, কবরের আজাব হয়, কারণ রূহ জীবিত থাকে।
তাহলে ঈসা যিনি নিজেই রূহ, তিনি কিভাবে মরবেন?
কোরআন নিজেই বলছে:
وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَـٰكِن شُبِّهَ لَهُمْ
অর্থাৎ, "এবং তারা তাঁকে হত্যা করেনি এবং ক্রুশে দেয়নি, বরং তাদের কাছে সাদৃশ্য মনে হয়েছে।" (সূরা নিসা ৪:১৫৭)
কোরআন পরিষ্কার বলছে ঈসা মরেননি। কেন? কারণ তিনি "রূহ।" রূহ মরে না।
📕 আরও গবেষণার জন্য বই ও সূত্র গুলো পড়তে পারেন
টেবিলের ক্রমানুসারে বিবেচ্য: বই/সূত্র > লেখক > বিষয়
| তাফসীরুল কোরআনিল আযীম > ইমাম ইবনে কাসীর > সূরা নিসা ৪:১৭১ এর তাফসির
| তাফসীরে কবির (মাফাতিহুল গাইব) > ইমাম ফখরুদ্দিন রাযী > রূহুন মিনহু এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা
| জামিউল বায়ান > ইমাম তাবারী > রূহ শব্দের ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
| আল জামি লি আহকামিল কোরআন > ইমাম কুরতুবী > আদম ও ঈসার পার্থক্য
| সহীহ বুখারী > ইমাম বুখারী > হাদিস নং ৩৪৩৫
| সহীহ মুসলিম > ইমাম মুসলিম > হাদিস নং ২৮
| ইঞ্জিল শরীফ > মথি, লূক, যোহন > পবিত্র আত্মা ও ঈসা
| লিসানুল আরব > ইবনে মানযুর > রূহ শব্দের আরবি অভিধানিক অর্থ
প্রিয় পাঠক, আপনার জন্য একটি আমন্ত্রণ
ঈসা মসীহ শুধু একজন নবী নন।
তিনি শুধু একজন রাসূল নন।
তিনি আল্লাহর কালেমা।
তিনি আল্লাহর রূহ।
তিনি জীবনদাতা।
তিনি মৃত্যুজয়ী।
কোরআন বলছে।
হাদিস বলছে।
বাইবেল বলছে।
সবাই একই কথা বলছে: ঈসা মসীহ অনন্য। তাঁর মতো আর কেউ নেই।
এখন প্রশ্ন হলো, আপনি কি তাঁকে গ্রহণ করবেন? আপনি কি বিশ্বাস করবেন যে তিনি শুধু একজন মানুষ নন, তিনি আল্লাহর রূহের প্রকাশ?
ঈসা মসীহ নিজে বলেছেন: "আমিই সেই জীবন-খাদ্য। যে ব্যক্তি আমার কাছে আসে, সে ক্ষুধার্ত হবে না এবং যে আমাতে ঈমান আনে, সে তৃষ্ণার্ত হবে না, কখনও না।” ইউহোন্না ৬:৩৫
আপনার হৃদয় কি তৃষ্ণার্ত? আপনার আত্মা কি শান্তি খুঁজছে?
তবে, এখনই আসুন তাঁর কাছে।
🕊️ একটি ছোট দোয়া, আপনি যদি চান, এখনই এই দোয়াটি করতে পারেন:
"হে আল্লাহ, তুমি সত্যের মালিক। ঈসা মসীহ যদি সত্যিই তোমার পাক-রূহ হন, তাহলে আমার হৃদয়ে এই সত্য প্রকাশ করো। আমার আত্মায় তোমার রূহ ঢেলে দাও। আমাকে জীবনের পথ দেখাও। আমীন।"
এই লেখাটি শেয়ার করুন। হয়তো আপনার এই একটি শেয়ার কারো জীবনে চিরন্তন জীবনের দরজা খুলে দিতে পারে।
কোরআনে ঈসা মসীহকে কেন "আল্লাহর রূহ" বলা হয়েছে?