নেক আমল বনাম আল্লাহর পবিত্রতা:
এক ফোঁটা নাপাকি কি পুরো বালতির দুধ নষ্ট করে না?
আমরা যখনই নাজাতের কথা ভাবি, তখনই আমাদের মাথায় একটি সরল সমীকরণ কাজ করে: "আমি যত বেশি নেক আমল করব, আমার গুনাহ তত বেশি মাফ হবে।" কিন্তু আমরা কি কখনো আল্লাহর প্রকৃত 'পবিত্রতা' (হোলিনেস) সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করেছি?
আল্লাহ সম্পূর্ণ পবিত্র। পবিত্র কোরআনের সূরা আল-হাশর ৫৯:২৩ আয়াতে আল্লাহকে "আল-কুদ্দুস" অর্থাৎ "পরম পবিত্র" বলা হয়েছে। তাঁর মধ্যে বিন্দুমাত্র অপবিত্রতা, দাগ বা অন্ধকারের স্থান নেই। অন্যদিকে আমরা, মানুষেরা, প্রতিদিন কোনো না কোনো গুনাহ করছি। কখনো চোখের দৃষ্টিতে, কখনো কথায়, কখনো বা মনের গোপন চিন্তায়। সূরা আন-নাহল ১৬:৬১ আয়াতে আল্লাহ বলছেন, যদি তিনি মানুষকে তাদের জুলুমের কারণে সাথে সাথে শাস্তি দিতেন, তবে পৃথিবীতে কোনো প্রাণীই বেঁচে থাকত না।
এখন একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে চিন্তা করুন। এক বালতি বিশুদ্ধ এবং সুস্বাদু দুধের মধ্যে যদি মাত্র এক ফোঁটা ড্রেনের দুর্গন্ধযুক্ত পানি পড়ে, আপনি কি সেই দুধ আর পান করবেন? কখনোই না। আপনার কাছে সেই এক ফোঁটা নাপাকি পুরো বালতি দুধকে অপবিত্র করে দিয়েছে।
ঠিক একইভাবে, আপনার সারাজীবনের হাজারো নেক আমল, নামাজ, রোজা এবং দান-সদকা কি সেই বিশুদ্ধ দুধের মতো নয়? আর আপনার জীবনে করা একটি ছোট গুনাহ, একটি মিথ্যা কথা বা একটি খারাপ চিন্তা কি সেই এক ফোঁটা ড্রেনের পানির মতো নয়? যদি এক ফোঁটা নাপাকি পুরো বালতি দুধ নষ্ট করে দিতে পারে, তবে আমাদের হাজারো নেক আমলের মধ্যে থাকা একটি গুনাহও কি আল্লাহর পরম পবিত্র জান্নাতে প্রবেশের পথে সবচেয়ে বড় বাধা নয়?
আল্লাহ পবিত্র, আর কোনো অপবিত্র জিনিস তাঁর উপস্থিতিতে থাকতে পারে না। আমরা তওবা করি, আল্লাহ রহমানুর রাহিম হিসেবে মাফও করেন। কিন্তু একটি চরম সত্য হলো, আমরা তওবা করার পর আবারও একই গুনাহ করি, অথবা নতুন কোনো গুনাহে লিপ্ত হই। সূরা আন-নিসা ৪:১৭ আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাদেরই তওবা কবুল করেন যারা অজ্ঞতাবশত গুনাহ করে এবং দ্রুত ফিরে আসে। কিন্তু আমরা যারা জেনে-বুঝে বারবার গুনাহর চক্রে আটকে আছি, আমাদের তওবার গ্যারান্টি কোথায়?
নেক আমল কখনো গুনাহর শাস্তি বাতিল করতে পারে না। আপনি যদি আদালতে গিয়ে বিচারককে বলেন, "মাননীয় বিচারক, আমি একটি চুরি করেছি ঠিকই, কিন্তু আমি জীবনে অনেক গরিব মানুষকে খাইয়েছি, তাই আমাকে চুরির শাস্তি থেকে মাফ করে দিন"; বিচারক কি আপনাকে মাফ করবেন? একজন ন্যায়বিচারক কখনোই ভালো কাজের বিনিময়ে অপরাধের শাস্তি মওকুফ করতে পারেন না। অপরাধের শাস্তি পেতেই হবে।
আল্লাহ তো সর্বশ্রেষ্ঠ ন্যায়বিচারক (আহকামুল হাকিমিন)। সূরা আত-তীন ৯৫:৮ আয়াতে তাঁকে এই উপাধি দেওয়া হয়েছে। একজন নিখুঁত ন্যায়বিচারক হিসেবে আল্লাহ কি আমাদের গুনাহর শাস্তি না দিয়ে শুধু আমাদের নেক আমলের দিকে তাকিয়ে আমাদের জান্নাতে প্রবেশ করতে দেবেন? এটি কি তাঁর ন্যায়বিচারের পরিপন্থী নয়?
তাহলে আমাদের উপায় কী? আমাদের এই পাপের দুষ্টচক্র থেকে স্থায়ী মুক্তির পথ কোথায়? কীভাবে আল্লাহর ন্যায়বিচার এবং তাঁর রহমত একই সাথে পূর্ণ হতে পারে?
পূর্ববর্তী আসমানি কিতাব, বিশেষ করে তাওরাত এবং ইঞ্জিল শরীফে, আল্লাহ এমন এক নিখুঁত সমাধানের কথা বলেছেন, যেখানে মানুষের নেক আমলের অসম্পূর্ণতাকে একটি 'মহান কাফফারা' বা মূল্যের মাধ্যমে পূর্ণ করা হয়েছে। সেই সমাধানটি কী, যা আল্লাহর ন্যায়বিচারকেও অক্ষুণ্ণ রাখে আবার মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকেও ১০০% নিশ্চয়তার সাথে রক্ষা করে?
আসুন, আমরা পরবর্তী অংশে সেই হারানো সত্যের দিকে তাকাই, যা হয়তো এতদিন আমাদের চোখের আড়ালেই ছিল।