আদি পাপ ও মানবজাতির পতন
গুনাহ কীভাবে আমাদের ও আল্লাহর মধ্যে দেয়াল তুলে দিলো?”

গুনাহ কীভাবে আমাদের ও আল্লাহর মধ্যে দেয়াল তুলে দিলো?

এই একটি প্রশ্ন যা প্রতিটি মানুষের নিজেকে করা উচিত

আপনি নিশ্চয়ই আমার মতোই অনেক ভেবেছেন, প্রশ্ন করেছেন, পৃথিবীতে এত দুঃখ, কষ্ট, অন্যায়, রোগ ও মৃত্যু কেন? আল্লাহ তায়ালা যদি রহমানুর রাহীম হন, তিনি যদি সবকিছু সুন্দর করে সৃষ্টি করে থাকেন, তাহলে এই পৃথিবীতে এত যন্ত্রণা কেন?

আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হলো, আপনি নিজে কি কখনো গুনাহ করেছেন? মিথ্যা বলেছেন? হিংসা করেছেন? রাগে কাউকে কষ্ট দিয়েছেন? মনে মনে এমন কিছু ভেবেছেন যা আল্লাহর সামনে লজ্জাজনক?

আমরা সবাই জানি উত্তরটি হ্যাঁ। কিন্তু কেন? আমরা কেন বারবার গুনাহ করি, যদিও আমরা জানি এটি ভুল? আমাদের ভেতরে এমন কী আছে যা আমাদের ক্রমাগত অবাধ্যতার দিকে টেনে নিয়ে যায়?

কিতাবুল মোকাদ্দস বলছে, এর উত্তর লুকিয়ে আছে মানবজাতির একদম শুরুতে, আদম ও হাওয়ার সেই প্রথম গুনাহর ঘটনায়। সেই একটি মাত্র অবাধ্যতা শুধু তাঁদের জীবন নয়, বরং সমস্ত মানবজাতির ভাগ্য চিরকালের জন্য বদলে দিয়েছিল।

আসুন, তাওরাত শরীফ, কুরআন শরীফ এবং যুক্তির আলোকে বুঝি, সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল এবং সেই ঘটনা আজও আমাদের জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করছে।

প্রথমত: সৃষ্টির শুরুতে সবকিছু কেমন ছিল?

গুনাহর গল্প বোঝার আগে, আমাদের বুঝতে হবে গুনাহর আগে পৃথিবী কেমন ছিল। তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক) বলছে, আল্লাহ তায়ালা যখন সবকিছু সৃষ্টি করলেন, তখন সবকিছুই ছিল নিখুঁত ও সুন্দর।

"আল্লাহ তাঁর সৃষ্ট সবকিছুর দিকে তাকালেন, আর দেখলেন সমস্তই অতি উত্তম।"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ১:৩১ আয়াত)

তারপর আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করলেন এবং তাঁর সাথে মানুষের একটি অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল:

"আল্লাহ মাটির ধুলো দিয়ে মানুষকে গড়লেন এবং তার নাকে জীবনের ফুঁক দিলেন, আর মানুষ জীবিত প্রাণী হয়ে উঠলো।"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ২:৭ আয়াত)

আল্লাহ তায়ালা আদম ও হাওয়াকে একটি সুন্দর বাগানে (জান্নাতুল আদন / Garden of Eden) রাখলেন। সেখানে কোনো দুঃখ ছিল না, কোনো রোগ ছিল না, কোনো মৃত্যু ছিল না। মানুষ ও আল্লাহর মধ্যে কোনো দেয়াল ছিল না। তাঁরা সরাসরি আল্লাহর সাথে কথা বলতেন, তাঁর উপস্থিতিতে বাস করতেন।

এটিই ছিল আল্লাহর মূল পরিকল্পনা: মানুষ তাঁর সাথে চিরকাল ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে থাকবে। কোনো গুনাহ নেই, কোনো মৃত্যু নেই, কোনো বিচ্ছেদ নেই।

কিন্তু আল্লাহ তায়ালা মানুষকে একটি বিশেষ জিনিস দিয়েছিলেন যা অন্য কোনো সৃষ্টিকে দেওয়া হয়নি: স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি (Free Will)। মানুষ রোবট নয়। আল্লাহ চাননি যে মানুষ জোর করে তাঁর বাধ্য থাকুক। তিনি চেয়েছিলেন মানুষ ভালোবাসার কারণে, নিজের ইচ্ছায় তাঁর অনুগত থাকুক।

আর এই স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহ একটি মাত্র নিষেধাজ্ঞা দিলেন:

"আল্লাহ আদমকে হুকুম দিয়ে বললেন, 'বাগানের যেকোনো গাছের ফল তুমি খেতে পারো, কিন্তু ভালো-মন্দ জ্ঞানের গাছের ফল খেয়ো না। কারণ যেদিন তুমি তা খাবে, সেদিন তুমি অবশ্যই মরবে।'"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ২:১৬-১৭ আয়াত)

লক্ষ্য করুন, আল্লাহ স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিলেন: অবাধ্যতার পরিণতি হলো মৃত্যু। এটি কোনো হালকা সতর্কতা ছিল না, এটি ছিল আল্লাহর ন্যায়বিচারের ঘোষণা।

দ্বিতীয়ত: সেই ভয়ংকর দিন যেদিন সবকিছু বদলে গেল

তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক) এর ৩য় অধ্যায়ে সেই ঘটনা বর্ণিত আছে যা মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে দুঃখজনক মুহূর্ত।

শয়তান (ইবলিস) সাপের রূপ ধারণ করে হাওয়ার কাছে এলো এবং তাঁকে প্রলোভিত করলো:

"সাপ নারীকে বললো, 'তোমরা মোটেও মরবে না। আল্লাহ জানেন যে, যেদিন তোমরা সেই ফল খাবে সেদিন তোমাদের চোখ খুলে যাবে এবং তোমরা আল্লাহর মতো হয়ে যাবে, ভালো-মন্দ জানতে পারবে।'"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ৩:৪-৫ আয়াত)

শয়তানের কৌশল লক্ষ্য করুন। সে তিনটি কাজ করলো: প্রথমত, আল্লাহর কথাকে মিথ্যা বললো ("তোমরা মরবে না")। দ্বিতীয়ত, আল্লাহর উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ তৈরি করলো ("আল্লাহ তোমাদের কাছ থেকে লুকাচ্ছেন")। তৃতীয়ত, মানুষের অহংকারকে জাগিয়ে তুললো ("তোমরা আল্লাহর মতো হয়ে যাবে")। এই একই কৌশল শয়তান আজও ব্যবহার করে।

এরপর কী ঘটলো?

"নারী দেখলেন যে সেই গাছের ফল খেতে ভালো, দেখতে সুন্দর এবং জ্ঞান লাভের জন্য লোভনীয়। তিনি সেই ফল নিয়ে খেলেন এবং তাঁর সাথে থাকা তাঁর স্বামীকেও দিলেন, আর তিনিও খেলেন।"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ৩:৬ আয়াত)

আর সাথে সাথে সবকিছু বদলে গেল:

"তখন তাঁদের দুজনেরই চোখ খুলে গেল এবং তাঁরা বুঝতে পারলেন যে তাঁরা উলঙ্গ। তাঁরা ডুমুর পাতা জোড়া দিয়ে নিজেদের ঢাকলেন।"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ৩:৭ আয়াত)

গুনাহ করার সাথে সাথে তাঁদের মধ্যে লজ্জা, ভয় ও অপরাধবোধ জন্ম নিলো। তাঁরা আল্লাহর কাছ থেকে লুকাতে শুরু করলেন। যে আল্লাহর সাথে তাঁরা সরাসরি কথা বলতেন, সেই আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে তাঁদের ভয় লাগতে শুরু করলো। গুনাহ মানুষ ও আল্লাহর মধ্যে একটি দেয়াল তুলে দিলো।

তৃতীয়ত: আল্লাহর ন্যায়বিচার ও গুনাহর পরিণতি

আল্লাহ তায়ালা আগেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন: "যেদিন তুমি তা খাবে, সেদিন তুমি অবশ্যই মরবে।" এখন আল্লাহর সামনে দুটি পথ ছিল:

পথ ১: মানুষকে ক্ষমা করে দেওয়া এবং গুনাহকে উপেক্ষা করা।
কিন্তু এটি করলে আল্লাহর ন্যায়বিচার (আদল) প্রশ্নবিদ্ধ হতো। যে আল্লাহ বলেছিলেন "তুমি মরবে", তিনি যদি সেই কথা পূরণ না করেন, তাহলে তাঁর কথার কি কোনো মূল্য থাকে? একজন ন্যায়বিচারক বিচারক কি অপরাধীকে শাস্তি না দিয়ে ছেড়ে দিতে পারেন?

পথ ২: মানুষকে সাথে সাথে ধ্বংস করে দেওয়া।
কিন্তু আল্লাহ তায়ালা মানুষকে ভালোবাসেন। তিনি মানুষকে ধ্বংস করতে চান না।

এখানেই আল্লাহর রহমত ও ইনসাফের মধ্যে একটি টানাপোড়েন তৈরি হলো। আল্লাহ একইসাথে ন্যায়বিচারক এবং দয়ালু। তিনি গুনাহকে উপেক্ষা করতে পারেন না (কারণ তিনি আদিল), আবার মানুষকে ধ্বংস করতেও চান না (কারণ তিনি রহমানুর রাহীম)। তাহলে কী করবেন তিনি?

আল্লাহ তায়ালা একটি তৃতীয় পথ বেছে নিলেন, যা ছিল তাঁর মহাপরিকল্পনার শুরু।

আল্লাহ গুনাহর শাস্তি ঘোষণা করলেন:

"তুমি ধুলো, আর ধুলোতেই ফিরে যাবে।"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ৩:১৯ আয়াত)

মৃত্যু পৃথিবীতে প্রবেশ করলো। শারীরিক মৃত্যু এবং আধ্যাত্মিক মৃত্যু, অর্থাৎ আল্লাহর কাছ থেকে বিচ্ছিন্নতা।

কিন্তু একই সাথে আল্লাহ একটি আশ্চর্যজনক প্রতিশ্রুতি দিলেন। শয়তানকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন:

"আমি তোমার ও নারীর মধ্যে, তোমার বংশ ও নারীর বংশের মধ্যে শত্রুতা রাখব। সে তোমার মাথা পিষে দেবে এবং তুমি তার পায়ের গোড়ালিতে আঘাত করবে।"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ৩:১৫ আয়াত)

এটি কিতাবুল মোকাদ্দসের প্রথম এবং সবচেয়ে প্রাচীন ভবিষ্যদ্বাণী। আল্লাহ বলছেন, "নারীর বংশ" থেকে একজন আসবেন যিনি শয়তানের মাথা পিষে দেবেন। আমরা আগের আর্টিকেলে (ঈসা মসীহের অনন্য পরিচয়-এর কুমারী গর্ভে জন্ম) বিস্তারিত দেখেছি যে "নারীর বংশ" কথাটি কেন অলৌকিক এবং কীভাবে এটি ঈসা মসীহের কুমারী জন্মের দিকে ইঙ্গিত করে।

চতুর্থত: আল্লাহর প্রথম কুরবানি, রক্ত ছাড়া ক্ষমা নেই

গুনাহর পর আদম ও হাওয়া ডুমুর পাতা দিয়ে নিজেদের ঢাকার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁদের সেই মানবিক চেষ্টা গ্রহণ করলেন না। তাওরাত শরীফ বলছে:

"মাবুদ আল্লাহ আদম ও তাঁর স্ত্রীর জন্য চামড়ার পোশাক তৈরি করে তাঁদের পরিয়ে দিলেন।"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ৩:২১ আয়াত)

এখানে একটি অত্যন্ত গভীর সত্য লুকিয়ে আছে। চামড়ার পোশাক তৈরি করতে হলে একটি পশুকে মারতে হয়েছিল। অর্থাৎ আদম ও হাওয়ার গুনাহ ঢাকার জন্য আল্লাহ নিজেই একটি প্রাণী কুরবানি করলেন। একটি নিরপরাধ প্রাণীর রক্ত ঝরলো, যেন গুনাহগার মানুষের লজ্জা ঢাকা যায়।

এটিই ছিল ইতিহাসের প্রথম কুরবানি। এবং এটি আল্লাহ নিজে করেছিলেন। মানুষের নিজের চেষ্টা (ডুমুর পাতা) যথেষ্ট ছিল না। আল্লাহকেই একটি বিকল্প ব্যবস্থা করতে হলো।

এখান থেকেই একটি ঐশ্বরিক নীতি প্রতিষ্ঠিত হলো: রক্তপাত ছাড়া গুনাহর ক্ষমা নেই। এই নীতিটি পরবর্তীতে তাওরাত শরীফে আরও স্পষ্টভাবে ঘোষিত হয়েছে:

"কারণ প্রাণীর প্রাণ তার রক্তে আছে। আমি নিজে তোমাদের জন্য কুরবানগাহের ওপর সেই রক্ত দিয়েছি তোমাদের প্রাণের কাফফারা দেওয়ার জন্য। কারণ রক্তই প্রাণের বিনিময়ে কাফফারা দেয়।"
(তাওরাত শরীফ (লেবীয় পুস্তক), লেবীয় ১৭:১১ আয়াত)

পঞ্চমত: কুরআন শরীফের সত্যায়ন

কুরআন শরীফও আদম ও হাওয়ার গুনাহর ঘটনাকে সত্যায়ন করে। সূরা আল-আ'রাফে বলা হয়েছে:

"অতঃপর শয়তান তাদের দুজনকে সেখান থেকে পদস্খলিত করলো এবং তারা যে অবস্থায় ছিল তা থেকে তাদের বের করে দিলো। আমি বললাম, 'তোমরা নেমে যাও। তোমরা একে অপরের শত্রু। পৃথিবীতে কিছুকালের জন্য তোমাদের বসবাস ও জীবিকা রইলো।'"
(সূরা আল-আ'রাফ, ৭:২৪ আয়াত)

এবং সূরা ত্বহায় বলা হয়েছে:

"আদম তার রবের অবাধ্য হলো, ফলে সে পথভ্রষ্ট হলো।"
(সূরা ত্বহা, ২০:১২১ আয়াত)

কিতাবুল মোকাদ্দস এবং কুরআন উভয়ই একমত যে আদম নবী আল্লাহর অবাধ্য হয়েছিলেন এবং এর ফলে তাঁকে জান্নাত (বেহেশত) থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। এটি কোনো ছোটখাটো ভুল ছিল না, এটি ছিল সৃষ্টিকর্তার সরাসরি আদেশ অমান্য করা।

ষষ্ঠত: গুনাহ কি শুধু আদমের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল?

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: আদমের সেই গুনাহ কি শুধু তাঁর একার বিষয় ছিল, নাকি এটি সমস্ত মানবজাতিকে প্রভাবিত করেছে?

ইঞ্জিল শরীফ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলছে:

"একজন মানুষের (আদমের) মাধ্যমে গুনাহ দুনিয়ায় প্রবেশ করেছে এবং গুনাহর মাধ্যমে মৃত্যু এসেছে। এভাবে মৃত্যু সকল মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে, কারণ সকলেই গুনাহ করেছে।"
(ইঞ্জিল শরীফ (রোমীয়), রোমীয় ৫:১২ আয়াত)

এখানে বলা হচ্ছে যে আদমের গুনাহর মধ্য দিয়ে গুনাহর স্বভাব সমস্ত মানবজাতির মধ্যে প্রবেশ করেছে।

এটি বুঝতে একটি সাধারণ উদাহরণ দেওয়া যায়। একটি ঝরনার উৎসে যদি বিষ মেশানো হয়, তাহলে সেই ঝরনা থেকে যত নদী-নালা বের হবে, সবগুলোতেই বিষ থাকবে। আদম ছিলেন মানবজাতির "উৎস"। তাঁর মধ্যে যখন গুনাহ প্রবেশ করলো, তখন তাঁর থেকে জন্ম নেওয়া প্রতিটি মানুষের মধ্যেও সেই গুনাহর স্বভাব চলে এলো।

এই কারণেই কোনো মানুষকে গুনাহ করতে শেখাতে হয় না। একটি ছোট শিশুকে কেউ মিথ্যা বলতে শেখায় না, কিন্তু সে নিজে থেকেই মিথ্যা বলতে শেখে। কেউ তাকে স্বার্থপর হতে শেখায় না, কিন্তু সে নিজে থেকেই "আমার, আমার" বলে জিনিস আঁকড়ে ধরে। এটি গুনাহর সেই জন্মগত স্বভাব যা আদম থেকে প্রতিটি মানুষের মধ্যে এসেছে।

যাবুর শরীফ (গীতসংহিতা)-এ দাউদ নবী লিখেছেন:

"দেখো, আমি গুনাহর মধ্যেই জন্মেছি, গুনাহর মধ্যেই আমার মা আমাকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন।"
(যাবুর শরীফ (গীতসংহিতা), ৫১:৫ আয়াত)

দাউদ নবী নিজেই স্বীকার করছেন যে তিনি জন্মগতভাবেই গুনাহর স্বভাব নিয়ে জন্মেছেন। এটি কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, এটি সমস্ত মানবজাতির সমস্যা।

সপ্তমত: আমল দিয়ে কি এই সমস্যার সমাধান সম্ভব?

এখন সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নে আসি। অনেকে মনে করেন, "আমি যদি বেশি বেশি নেক আমল করি, নামাজ পড়ি, রোজা রাখি, দান-খয়রাত করি, তাহলে আমার গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।"

কিন্তু কিতাবুল মোকাদ্দস বলছে এটি সম্ভব নয়। কেন?

"আমরা সবাই অশুচি মানুষের মতো হয়ে গেছি এবং আমাদের সমস্ত ন্যায়ের কাজ নোংরা কাপড়ের মতো।"
(নবীদের কিতাব (যিশাইয়), ইশাইয়া ৬৪:৬ আয়াত)

এটি একটি কঠিন সত্য, কিন্তু বাস্তব। আল্লাহ তায়ালা এতটাই পবিত্র যে, তাঁর সামনে আমাদের সবচেয়ে ভালো কাজগুলোও যথেষ্ট নয়। কারণ সমস্যাটি আমাদের কাজে নয়, সমস্যাটি আমাদের স্বভাবে। আমরা যতই ভালো কাজ করি, আমাদের ভেতরের গুনাহর স্বভাব বদলায় না।

একটি সাধারণ উদাহরণ দেওয়া যায়। ধরুন, একটি গ্লাসে পরিষ্কার পানি আছে। এখন যদি সেই পানিতে এক ফোঁটা বিষ মেশানো হয়, তাহলে কি আরও বেশি পরিষ্কার পানি ঢাললে বিষ দূর হবে? না, পুরো গ্লাসের পানিই বিষাক্ত থেকে যাবে। ঠিক তেমনি, আমাদের ভালো কাজগুলো (পরিষ্কার পানি) আমাদের ভেতরের গুনাহর স্বভাবকে (বিষ) দূর করতে পারে না।

ইঞ্জিল শরীফ আরও স্পষ্টভাবে বলছে:

"কারণ শরীয়তের কাজ দিয়ে কোনো মানুষ আল্লাহর সামনে ধার্মিক সাব্যস্ত হতে পারে না।"
(ইঞ্জিল শরীফ (রোমীয়), রোমীয় ৩:২০ আয়াত)

"কারণ সকলেই গুনাহ করেছে এবং আল্লাহর মহিমা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।"
(ইঞ্জিল শরীফ (রোমীয়), রোমীয় ৩:২৩ আয়াত)

"সকলেই গুনাহ করেছে", এখানে কোনো ব্যতিক্রম নেই। ঈসা মসীহ ব্যতীত কোনো মানুষ গুনাহমুক্ত নয়। আর ঈসা মসীহ ছাড়া কোনো নবীও নিজেকে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ দাবি করেননি।

তাহলে? সমস্যাটিকে কি চেনা হলো, এবার সমাধান কোথায়?

প্রিয় পাঠক, আজকে আমরা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সত্য জানলাম:

প্রথমত, আল্লাহ তায়ালা মানুষকে নিখুঁত করে সৃষ্টি করেছিলেন এবং তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে রেখেছিলেন।

দ্বিতীয়ত, আদম ও হাওয়ার অবাধ্যতার মধ্য দিয়ে গুনাহ ও মৃত্যু পৃথিবীতে প্রবেশ করেছে।

তৃতীয়ত, গুনাহর স্বভাব আদম থেকে সমস্ত মানবজাতির মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।

চতুর্থত, নিজের আমল দিয়ে এই জন্মগত গুনাহর স্বভাব থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

পঞ্চমত, আল্লাহর ন্যায়বিচার দাবি করে যে গুনাহর মূল্য অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে, আর সেই মূল্য হলো রক্ত। কিতাবুল মোকাদ্দসের প্রথম পাতায়ই আল্লাহ নিজেই এই নীতি প্রতিষ্ঠা করেছেন।

কিন্তু যদি মানুষ নিজে নিজেকে বাঁচাতে না পারে, তাহলে কে বাঁচাবে? আল্লাহ কি মানুষকে এই অবস্থায় ফেলে রেখেছেন? নাকি তিনি একটি পথ তৈরি করেছেন?

হ্যাঁ, আল্লাহ তায়ালা একটি পথ তৈরি করেছেন। আর সেই পথটি বুঝতে হলে আমাদের দেখতে হবে আদম থেকে শুরু করে মূসা নবী পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা কেন বারবার পশু কুরবানির ব্যবস্থা করেছেন এবং সেই কুরবানির রক্তের ধারা কোন দিকে ইঙ্গিত করছে।

পরবর্তী আমরা সেই বিস্ময়কর ধারা অনুসরণ করব। পড়ুন: "প্রাচীন কুরবানি ব্যবস্থা: আদম থেকে মূসা পর্যন্ত রক্তের ধারা কোথায় যাচ্ছে?"

আপনার জন্য একটি প্রশ্ন

আপনি যদি আজ রাতে আল্লাহর সামনে দাঁড়ান এবং তিনি আপনাকে জিজ্ঞেস করেন, "তোমাকে কেন জান্নাতে দেওয়া উচিত?", আপনার উত্তর কী হবে?

আপনার নেক আমলের তালিকা? কিন্তু আপনার গুনাহর তালিকা কি তার চেয়ে ছোট?

কিতাবুল মোকাদ্দস বলছে:

"কারণ গুনাহর বেতন হলো মৃত্যু, কিন্তু আল্লাহর দান হলো আমাদের মাবুদ ঈসা মসীহের মধ্য দিয়ে অনন্ত জীবন।"
(ইঞ্জিল শরীফ (রোমীয়), রোমীয় ৬:২৩ আয়াত)

Stone tower under starry night sky with light painting.
Stone tower under starry night sky with light painting.
Great Wall of China during daytime
Great Wall of China during daytime
a branch with leaves
a branch with leaves
a cross that is lit up in the dark
a cross that is lit up in the dark