তাওরাত শরীফে
ঈসা মসীহের নিখুত ভবিষ্যদ্বাণী
পঞ্চমত: মাল্কীসিদ্দিক, রহস্যময় যাজক-রাজা (পয়দায়েশ ১৪:১৮-২০)
তাওরাত শরীফ-এ একটি অত্যন্ত রহস্যময় ব্যক্তি আছেন যাঁর নাম মাল্কীসিদ্দিক (মেলকিসেদক / Melchizedek)। তিনি হঠাৎ করেই তাওরাত শরীফ-এর পাতায় আবির্ভূত হন, কোনো বংশপরিচয় ছাড়া, কোনো জন্ম বা মৃত্যুর তথ্য ছাড়া, এবং তারপর আবার অদৃশ্য হয়ে যান।
"শালেমের রাজা অর্থাৎ জেরুজালেমের বাদশাহ্ মাল্কীসিদ্দিক রুটি ও আঙুরের রস নিয়ে এলেন। তিনি ছিলেন আল্লাহ তায়ালার একজন যাজক (ইমাম)। তিনি ইব্রাহিমকে বরকত দিয়ে বললেন, 'সর্বোচ্চ আল্লাহ, যিনি আসমান ও জমিনের মালিক, তাঁর পক্ষ থেকে ইব্রাহিমের ওপর বরকত হোক।'"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ১৪:১৮-১৯ আয়াত)
এবং ইব্রাহিম নবী তাঁকে নিজের সম্পদের দশমাংশ দান করলেন (অর্থাৎ তার সবকিছুর ১০ ভাগের ১ ভাগ):
"ইব্রাহিম তাঁকে সবকিছুর দশমাংশ দিলেন।"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ১৪:২০ আয়াত)
এখানে কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করুন:
ক. তাঁর নামের অর্থ:
হিব্রু ভাষায় "মালকী" (מַלְכִּי) অর্থ "আমার রাজা" এবং "সেদেক" (צֶדֶק) অর্থ "ন্যায়বিচার" বা "ধার্মিকতা"। অর্থাৎ মাল্কীসিদ্দিক মানে "ধার্মিকতার রাজা"। আবার তিনি ছিলেন "শালেমের রাজা"। হিব্রু ভাষায় "শালেম" (שָׁלֵם) শব্দটি "শালোম" (שָׁלוֹם / শান্তি) থেকে এসেছে। অর্থাৎ তিনি ছিলেন "শান্তির রাজা"।
"ধার্মিকতার রাজা" এবং "শান্তির রাজা" এই দুটি উপাধি একসাথে আর কার জন্য প্রযোজ্য? ঈসা মসীহকে নবীদের কিতাবে (যিশাইয়) ঠিক এভাবেই বর্ণনা করা হয়েছে:
"কারণ আমাদের জন্য একটি শিশু জন্মগ্রহণ করেছে... তাঁকে বলা হবে... শান্তির রাজপুত্র। তাঁর শাসন ও শান্তির কোনো শেষ থাকবে না... ন্যায়বিচার ও ধার্মিকতার দ্বারা তিনি রাজত্ব করবেন।"
(নবীদের কিতাব (যিশাইয়), ইশাইয়া ৯:৬-৭ আয়াত)
খ. তিনি একাধারে রাজা ও যাজক (ইমাম) ছিলেন:
তাওরাত শরীফ-এর ব্যবস্থায় রাজা ও যাজক দুটি সম্পূর্ণ আলাদা পদ ছিল। রাজারা আসতেন ইয়াহুদা গোত্র থেকে, আর যাজকরা আসতেন লেবি গোত্র থেকে। কেউ কখনো একসাথে দুটি পদ ধারণ করতে পারতেন না। কিন্তু মাল্কীসিদ্দিক ছিলেন একাধারে রাজা ও ইমাম (যাজক)। এটি একটি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ও ভবিষ্যদ্বাণীমূলক চিত্র।
পূর্ণতা: ঈসা মসীহ একাধারে রাজা (বাদশাহ) ও মহাযাজক (ইমামুল আযম)। তিনি আল্লাহর রাজ্যের চিরস্থায়ী বাদশাহ এবং একইসাথে তিনি নিজেকে কুরবানি দিয়ে মানবজাতির পক্ষে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়েছেন মহাযাজক হিসেবে।
গ. তাঁর কোনো বংশপরিচয়, জন্ম বা মৃত্যুর উল্লেখ নেই:
ইঞ্জিল শরীফ এই বিষয়টি গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেছে:
"তাঁর পিতা নেই, মাতা নেই, বংশতালিকা নেই। তাঁর জীবনের শুরু নেই, শেষও নেই। তিনি আল্লাহর পুত্রের সদৃশ; তিনি চিরকাল যাজক (ইমাম) থাকেন।"
(ইঞ্জিল শরীফ (ইব্রীয়), ইব্রীয় ৭:৩ আয়াত)
মাল্কীসিদ্দিক এর কোনো শুরু নেই, শেষ নেই, তিনি চিরকালীন ইমাম বা যাজক। এটি কি একজন সাধারণ মানুষের বর্ণনা? নিশ্চয়ই না। এটি ঈসা মসীহর চিরস্থায়ী ইমামতির প্রতীক। তাওরাত শরীফের লেবীয় যাজকরা মারা যেতেন এবং তাঁদের জায়গায় নতুন যাজক আসতেন। কিন্তু ঈসা মসীহের ইমামতি চিরস্থায়ী, কারণ তিনি মৃত্যুকে জয় করেছেন।
ঘ. ইব্রাহিম তাঁকে দশমাংশ দিয়েছিলেন:
ছোট ব্যক্তি বড় ব্যক্তিকে দশমাংশ দেন, উল্টো নয়। ইব্রাহিম নবী, যিনি সকল বিশ্বাসীর পিতা, তিনি মাল্কীসিদ্দিককে দশমাংশ দিয়েছিলেন। এর মানে মাল্কীসিদ্দিক ইব্রাহিমের চেয়েও বড়।
"এতে কোনো সন্দেহ নেই যে ছোট ব্যক্তিই বড় ব্যক্তির কাছ থেকে বরকত পান।"
(ইঞ্জিল শরীফ, ইব্রীয় ৭:৭ আয়াত)
ঙ. তিনি রুটি ও আঙুরের রস এনেছিলেন:
মাল্কীসিদ্দিক "রুটি ও আঙুরের রস" নিয়ে এসেছিলেন। ঈসা মসীহ তাঁর শেষ ভোজে (Last Supper) সাহাবীদের সাথে রুটি ও আঙুরের রস ভাগ করে নিয়ে বলেছিলেন:
"এটি আমার দেহ যা তোমাদের জন্য দেওয়া হচ্ছে... এই পেয়ালা আমার রক্তে নতুন নিয়ম।"
(ইঞ্জিল শরীফ, লূক ২২:১৯-২০ আয়াত)
মাল্কীসিদ্দিকের রুটি ও আঙুরের রস ছিল ঈসা মসীহর শেষ ভোজের পূর্বাভাস! হাজার বছর আগের একটি ছোট্ট ঘটনা যা ভবিষ্যতের সবচেয়ে পবিত্র মুহূর্তের দিকে ইঙ্গিত করছিল!
যাবুর শরীফ-এও মাল্কীসিদ্দিকের সাথে মসীহর সংযোগ স্পষ্টভাবে আছে:
"মাবুদ শপথ করেছেন এবং তিনি মন বদলাবেন না: 'তুমি মাল্কীসিদ্দিকের রীতি অনুসারে চিরকালের যাজক (ইমাম)।'"
(যাবুর শরীফ (গীতসংহিতা), ১১০:৪ আয়াত)
ষষ্ঠত: ইব্রাহিম ও ইসহাকের কুরবানি, ক্রুশের সবচেয়ে নিখুঁত পূর্বাভাস (পয়দায়েশ ২২)
আমরা আগের লেখায় (প্রাচীন কুরবানির ব্যবস্থা) এই ঘটনা দেখেছি, কিন্তু এখন আমরা প্রতিটি খুঁটিনাটি তুলনা করে দেখব এটি কীভাবে ঈসা মসীহর ক্রুশীয় কুরবানির সবচেয়ে নিখুঁত ছায়া।
তুলনামূলক বিশ্লেষণ (ইব্রাহিম/ইসহাক বনাম আল্লাহ/ঈসা মসীহ):
ক. "তোমার একমাত্র ছেলে, যাকে তুমি ভালোবাসো":
"আল্লাহ বললেন, 'তোমার ছেলেকে নাও, তোমার একমাত্র ছেলে, যাকে তুমি ভালোবাসো...'"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ২২:২ আয়াত)
তুলনা:
"কারণ আল্লাহ দুনিয়াকে এতই মহব্বত করলেন যে তিনি তাঁর একমাত্র পুত্রকে দান করলেন..."
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ৩:১৬ আয়াত)
ইব্রাহিম তাঁর "একমাত্র" ও "প্রিয়" ছেলেকে কুরবানি দিতে প্রস্তুত ছিলেন। আল্লাহও তাঁর "একমাত্র পুত্র" ঈসা মসীহকে মানবজাতির জন্য কুরবানি দিয়েছেন। ইব্রাহিমের ত্যাগ ছিল আল্লাহর নিজের ত্যাগের ছায়া। ইব্রাহিম শুধু প্রস্তুত হয়েছিলেন, কিন্তু আল্লাহ সত্যিই তাঁর পুত্রকে দিয়ে দিলেন।
খ. ছেলে নিজে কুরবানির কাঠ বহন করেছিলেন:
"ইব্রাহিম কুরবানির কাঠ তার ছেলের ওপর চাপিয়ে দিলেন। আর তিনি নিজে আগুন ও ছুরি হাতে নিলেন। এভাবে তাঁরা দুজনে একসাথে চললেন।"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ২২:৬ আয়াত)
তুলনা:
"তখন তারা ঈসাকে নিল; এবং তিনি নিজে ক্রুশ বহন করতে করতে বের হয়ে মাথার খুলি নামক স্থানে গেলেন। ইবরানী ভাষায় সেই স্থানকে গল্গথা বলে।"
(ইঞ্জিল শরীফ (ইউহোন্না), ইউহোন্না ১৯:১৭ আয়াত)
ইসাহাক নিজের পিঠে কুরবানির কাঠ বহন করে পাহাড়ে উঠেছিলেন। ঈসা মসীহ নিজের কাঁধে ক্রুশ (কাঠ) বহন করে গলগথা নামক পাহাড়ে উঠেছিলেন। কাঠের ওপর কুরবানি হওয়ার এই চিত্রটি হাজার বছর আগেই আঁকা হয়ে গিয়েছিল!
গ. ছেলে বাধা দেননি, স্বেচ্ছায় সমর্পণ করেছিলেন:
ইসাহাক তখন যুবক ছিলেন এবং বৃদ্ধ ইব্রাহিমকে সহজেই বাধা দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি স্বেচ্ছায় সমর্পণ করেছিলেন। ঈসা মসীহ-ও বলেছিলেন:
"কেউ আমার প্রাণ কেড়ে নেয় না, আমি নিজের ইচ্ছায় তা দিই।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ১০:১৮ আয়াত)
ঘ. "কুরবানির মেষশাবক কোথায়?" এই প্রশ্ন ও ভবিষ্যদ্বাণীমূলক উত্তর:
"ইসাহাক বললেন, 'বাবা, আগুন ও কাঠ তো আছে, কিন্তু পোড়ানো কুরবানির মেষশাবক কোথায়?' ইব্রাহিম বললেন, 'বাবা, আল্লাহ নিজেই কুরবানির মেষশাবক যোগান দেবেন।'"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ২২:৭-৮ আয়াত)
"আল্লাহ নিজেই মেষশাবক যোগান দেবেন" এটি ইব্রাহিমের মুখ থেকে বের হওয়া একটি ভবিষ্যদ্বাণী। এবং আল্লাহ সত্যিই নিজে সেই চূড়ান্ত মেষশাবকের ব্যবস্থা করেছেন। হযরত ইয়াহিয়া যখন প্রথমবার ঈসা মসীহকে দেখেছিলেন, তিনি চিৎকার করে বলেছিলেন:
"দেখো, আল্লাহর সেই মেষশাবক, যিনি দুনিয়ার গুনাহ বহন করে নিয়ে যান!"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ১:২৯ আয়াত)
ঙ. বিকল্প কুরবানি, ভেড়ার শিং ঝোপে আটকে ছিল:
"ইব্রাহিম চোখ তুলে তাকালেন এবং দেখলেন, পেছনে একটি ভেড়া তার শিং ঝোপে আটকে আছে। ইব্রাহিম সেই ভেড়াটি নিলেন এবং তার ছেলের বদলে সেটিকে কুরবানি হিসেবে উৎসর্গ করলেন।"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ২২:১৩ আয়াত)
ভেড়ার শিং "ঝোপে" আটকে ছিল। হিব্রু ভাষায় "সবাখ" (סְבַךְ) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ "ঝোপ" বা "কাঁটাঝোপ"। ঈসা মসীহর মাথায় কাঁটার মুকুট পরানো হয়েছিল:
"সৈন্যরা কাঁটা দিয়ে একটি মুকুট বানিয়ে তাঁর মাথায় পরিয়ে দিলো।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ১৯:২ আয়াত)
কাঁটাঝোপে আটকে থাকা ভেড়া, মাথায় কাঁটার মুকুট পরা ঈসা মসীহ। ইসাহাকের বদলে ভেড়া কুরবানি হলো, মানবজাতির বদলে ঈসা মসীহ কুরবানি হলেন। প্রতিটি বিষয় অদ্ভুতভাবে মিলে যাচ্ছে!
চ. মোরিয়া পাহাড় ও জেরুজালেম:
"আল্লাহ বললেন, '...মোরিয়া দেশে যাও। সেখানে আমি যে পাহাড়টি তোমাকে দেখিয়ে দেব তার ওপর তাকে কুরবানি করো।'"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ২২:২ আয়াত)
তাওরাত শরীফ ২ বংশাবলি (২ খান্দাননামা) বলছে মোরিয়া পাহাড় হলো সেই জায়গা যেখানে পরবর্তীতে সোলাইমানের ইবাদতখানা নির্মিত হয়েছিল:
"সোলাইমান মোরিয়া পাহাড়ে মাবুদের ঘর তৈরি করতে শুরু করলেন।"
(তাওরাত শরীফ (২ খান্দাননামা), ২ বংশাবলি ৩:১ আয়াত)
আর এটিই জেরুজালেম শহরের সেই একই এলাকা যেখানে ঈসা মসীহ ক্রুশে কুরবানি হয়েছিলেন! ইব্রাহিমের ভবিষ্যদ্বাণী "মাবুদের পাহাড়ে যোগান দেওয়া হবে" (পয়দায়েশ ২২:১৪) প্রায় ২,০০০ বছর পর সেই একই পাহাড়ে অক্ষরে অক্ষরে পূর্ণ হয়েছে!
ছ. ইসাহাক তৃতীয় দিনে "ফিরে পেলেন":
"তৃতীয় দিনে ইব্রাহিম চোখ তুলে দূর থেকে সেই স্থান দেখলেন।"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ২২:৪ আয়াত)
ইব্রাহিম যাত্রা শুরু করার পর তৃতীয় দিনে মোরিয়া পাহাড়ে পৌঁছেছিলেন। তাঁর মনে ইসাহাক ইতিমধ্যেই মৃত ছিলেন (কারণ আল্লাহ কুরবানি করতে বলেছিলেন)। কিন্তু তৃতীয় দিনে তিনি ইসহাককে জীবিত ফিরে পেলেন।
"ঈমানের দ্বারা ইব্রাহিম ইসাহাককে কুরবানি দিয়েছিলেন... তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে আল্লাহ মৃতদের মধ্য থেকেও জীবিত করতে পারেন, আর রূপক অর্থে তিনি তাকে মৃতদের মধ্য থেকে ফিরেও পেয়েছিলেন।"
(ইঞ্জিল শরীফ, ইব্রীয় ১১:১৭-১৯ আয়াত)
ইসাহাককে তৃতীয় দিনে "ফিরে পেলেন" (রূপক অর্থে মৃত্যু থেকে জীবিত)। ঈসা মসীহ তৃতীয় দিনে সত্যিই মৃত্যু থেকে জীবিত হয়ে উঠেছিলেন! এমনকি "তৃতীয় দিন" এর বিষয়টিও হাজার বছর আগে থেকেই ছায়া হিসেবে বিদ্যমান ছিল!
সপ্তমত: হযরত ইয়াকুবের ভবিষ্যদ্বাণী, রাজদণ্ড ইয়াহুদা থেকে যাবে না (পয়দায়েশ ৪৯:১০)
হযরত ইয়াকুব নবী (ইসরাইল) মৃত্যুশয্যায় তাঁর বারো ছেলেকে ভবিষ্যতের কথা বলেছিলেন। তাঁর চতুর্থ ছেলে ইয়াহুদা সম্পর্কে তিনি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন:
"রাজদণ্ড ইয়াহুদা থেকে সরবে না এবং শাসকের লাঠি তার পায়ের কাছ থেকে সরবে না যতদিন না তিনি আসেন যাঁর এটি প্রাপ্য (শীলোহ), আর জাতিগণ তাঁর বাধ্য হবে।"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ৪৯:১০ আয়াত)
এখানে কয়েকটি বিষয় গভীরভাবে বিশ্লেষণ করি:
ক. "রাজদণ্ড ইয়াহুদা থেকে সরবে না":
এর মানে হলো, মসীহ আসবেন ইয়াহুদা গোত্র থেকে।
পূর্ণতা: ঈসা মসীহ ইয়াহুদা গোত্রে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
"আমাদের মাবুদ ইয়াহুদা গোত্র থেকে এসেছেন, এটা স্পষ্ট।"
(ইঞ্জিল শরীফ, ইব্রীয় ৭:১৪ আয়াত)
খ. "শীলোহ" (שִׁילֹה):
হিব্রু শব্দ "শীলোহ" এর অর্থ নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে আলোচনা আছে, তবে অধিকাংশ পণ্ডিতের মতে এর অর্থ "যাঁর এটি প্রাপ্য" বা "যাঁকে এটি দেওয়া হবে"। প্রাচীন ইহুদি তালমুদ (Babylonian Talmud, Sanhedrin 98b) এবং তারগুম অনকেলোস (Targum Onkelos) এই আয়াতটিকে সরাসরি মসীহের ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।
গ. "জাতিগণ তাঁর বাধ্য হবে":
এখানে শুধু ইহুদি জাতি নয়, "জাতিগণ" (গোয়িম / גּוֹיִם) অর্থাৎ সমস্ত জাতি তাঁর বাধ্য হবে। এটি ইঙ্গিত করছে যে মসীহ শুধু ইহুদিদের জন্য নন, তিনি সমস্ত মানবজাতির জন্য।
পূর্ণতা: ঈসা মসীহর বার্তা শুধু ইহুদিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি পৃথিবীর প্রতিটি জাতি ও ভাষার কাছে পৌঁছেছে।
"এইজন্য তোমরা যাও, এবং সমস্ত জাতিকে আমার উম্মত করো।"
(ইঞ্জিল শরীফ, মথি ২৮:১৯ আয়াত)
অষ্টমত: ইউসুফের জীবন, মসীহের সবচেয়ে বিস্তারিত ছায়া (পয়দায়েশ ৩৭-৫০)
ইয়াকুব নবীর ছেলে ইউসুফের জীবন ঈসা মসীহর জীবনের সবচেয়ে বিস্তারিত ও হৃদয়গ্রাহী ছায়া। আসুন প্রতিটি মিল গভীরভাবে দেখি:
ক. পিতার সবচেয়ে প্রিয় পুত্র:
"ইসরাইল (ইয়াকুব) তাঁর সব ছেলের মধ্যে ইউসুফকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন।"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ৩৭:৩ আয়াত)
তুলনা: ঈসা মসীহ আল্লাহর প্রিয় পুত্র। বাপ্তিস্মের সময় আসমান থেকে আল্লাহর আওয়াজ এসেছিল:
"ইনি আমার প্রিয় পুত্র, তাঁর ওপর আমি সন্তুষ্ট।"
(ইঞ্জিল শরীফ, মথি ৩:১৭ আয়াত)
খ. নিজের ভাইদের দ্বারা ঘৃণিত ও প্রত্যাখ্যাত:
"তাঁর ভাইয়েরা তাঁকে হিংসা করতো এবং তাঁর সাথে শান্তিতে কথা বলতে পারতো না।"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ৩৭:৪ আয়াত)
তুলনা: ঈসা মসীহকে তাঁর নিজের জাতি প্রত্যাখ্যান করেছিল:
"তিনি নিজের জায়গায় (নিজের জাতির কাছে) এলেন, কিন্তু তাঁর নিজের লোকেরা তাঁকে গ্রহণ করলো না।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ১:১১ আয়াত)
গ. ত্রিশটি রূপার মুদ্রায় বিক্রি:
"সেই মাদিয়ানীয় ব্যবসায়ীরা কাছে আসতেই ভাইয়েরা ইউসুফকে গর্ত থেকে টেনে তুলল এবং বিশ টুকরা রূপার বদলে ইসমাইলীয়দের কাছে তাঁকে বেঁচে দিল।"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ৩৭:২৮ আয়াত)
তুলনা: ঈসা মসীহ-কে ত্রিশটি রূপার মুদ্রায় ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল:
"তারা তাকে (ইয়াহুদা ইস্কারিওতকে) ত্রিশটি রূপার মুদ্রা দিলো।"
(ইঞ্জিল শরীফ, মথি ২৬:১৫ আয়াত)
এখানে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় লক্ষ্য করুন। ইউসুফকে ২০ টুকরা রুপার বদলে (মুদ্রার বিনিময়ে) বিক্রি করা হয়েছিল, যা সেই সময়ের একজন দাসের মূল্য ছিল (তাওরাত শরীফ (লেবীয় পুস্তক), লেবীয় ২৭:৫)। আর ঈসা মসীহকে ৩০ শেকেলে (টি মুদ্রার বিনিময়ে) ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা তাওরাত শরীফ অনুযায়ী একজন দাসের ক্ষতিপূরণের মূল্য ছিল (তাওরাত শরীফ (যাত্রাপুস্তক), হিজরত ২১:৩২)। উভয় ক্ষেত্রেই আল্লাহর মনোনীত ব্যক্তিকে দাসের মূল্যে বিক্রি করা হয়েছে!
ঘ. মিথ্যা অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত:
হযরত ইউসুফকে পোটিফরের স্ত্রীর মিথ্যা অভিযোগে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল (পয়দায়েশ ৩৯:৭-২০)। ঈসা মসীহকেও মিথ্যা সাক্ষ্যের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল:
"প্রধান ইমাম ও পুরো সভা ঈসার বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য খুঁজছিলেন যেন তাঁকে হত্যা করতে পারেন।"
(ইঞ্জিল শরীফ, মথি ২৬:৫৯ আয়াত)
ঙ. দুজন অপরাধীর সাথে বন্দী:
কারাগারে ইউসুফের সাথে দুজন বন্দী ছিলেন, ফেরাউনের পানীয় পরিবেশক ও রুটি তৈরিকারক। একজন মুক্তি পেয়েছিলেন, অন্যজন মৃত্যুদণ্ড পেয়েছিলেন (পয়দায়েশ ৪০:১-২২)। ঈসা মসীহও ক্রুশে দুজন অপরাধীর মাঝখানে ঝুলেছিলেন। একজন ঈমান এনে মুক্তি পেয়েছিলেন, অন্যজন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন (ইঞ্জিল শরীফ, লূক ২৩:৩৯-৪৩ আয়াত)।
চ. দুঃখভোগের পর সর্বোচ্চ ক্ষমতায় উন্নীত:
"ফেরাউন ইউসুফকে বললেন, 'আমি তোমাকে সমস্ত মিশরের ওপর কর্তা বানালাম।'"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ৪১:৪১ আয়াত)
তুলনা:
"তাই আল্লাহও তাঁকে (ঈসা মসীহকে) সর্বোচ্চ স্থানে উন্নীত করেছেন এবং তাঁকে এমন নাম দিয়েছেন যা সব নামের ঊর্ধ্বে।"
(ইঞ্জিল শরীফ, ফিলিপীয় ২:৯ আয়াত)
ছ. যারা প্রত্যাখ্যান করেছিল, তাদেরই রক্ষাকর্তা হলেন:
ইউসুফের ভাইয়েরা তাঁকে বিক্রি করে দিয়েছিল। কিন্তু ইউসুফই দুর্ভিক্ষের সময় তাদের বাঁচিয়েছিলেন। তিনি তাদের ক্ষমা করে বলেছিলেন:
"তোমরা আমার সাথে যা মন্দ করতে চেয়েছিলে, আল্লাহ সেটাকেই মঙ্গলে পরিণত করেছেন, যেন অনেক মানুষের প্রাণ বাঁচে, যেমনটি আজ হচ্ছে।"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ৫০:২০ আয়াত)
তুলনা: ঈসা মসীহকেও তাঁর নিজের জাতি প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং ক্রুশে দিয়েছিল। কিন্তু তিনিই তাদের ও সমস্ত মানবজাতির নাজাতদাতা হলেন। ক্রুশের ওপর থেকে তিনি ক্ষমা করে বলেছিলেন:
"হে পিতা (আল্লাহ), এদের ক্ষমা করো, কারণ এরা জানে না এরা কী করছে।"
(ইঞ্জিল শরীফ, লূক ২৩:৩৪ আয়াত)
ইউসুফের জীবনের প্রতিটি ঘটনা ঈসা মসীহর জীবনের একটি ছায়া। পিতার প্রিয় পুত্র, ভাইদের ঘৃণা ও বিক্রি, মিথ্যা অভিযোগ, দুজন অপরাধীর সাথে বন্দী, দুঃখভোগ, সর্বোচ্চ ক্ষমতায় উন্নীত হওয়া, এবং শেষ পর্যন্ত যারা প্রত্যাখ্যান করেছিল তাদেরই ক্ষমা ও মুক্তি দেওয়া। একটি দুটি মিল হলে কাকতালীয় বলা যায়, কিন্তু এতগুলো মিল? এটি আল্লাহর সুনিপুণ পরিকল্পনা ছাড়া আর কিছু হতে পারে না।
পড়া চালিয়ে যান
প্রিয় পাঠক, আমাদের লেখাগুলো পড়ার সময় আপনার মনে অনেক কিছু নিয়ে সংশয় বা প্রশ্নের উদয় হতে পারে, তাই যদি আপনার ক্ষেত্রেও এমনটি হয়, তবে আর দেরি না করে এখনই আমাদেরকে তা লিখে জানাতে পারেন; আমরা অবশ্যই আপনাকে যথাযথ সহযোগীতা করবো, ইনশাল্লাহ্।
আপনার মনের অনুভুতি এখনই পাঠান
আপনার পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আমরা কোনো বিতর্ক ছাড়াই অত্যন্ত সম্মানের সাথে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর প্রদান করি।
কালিমাতুল্লাহ
সত্য অনুসন্ধানের পথে আপনাকে স্বাগতম
হোম-ব্লগ ও প্রবন্ধ-প্রশ্নোত্তর-সম্পদ-যোগাযোগ
যোগাযোগ
salam@alkalimatullah.org
গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা সম্পূর্ণ নিশ্চিত
© 2026 কালিমাতুল্লাহ-ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক সত্য অনুসন্ধান কেন্দ্র।
সত্য অনুসন্ধান করুন, কারণ সত্য আপনাকে মুক্ত করবে।