পূনরুত্থান
“মৃত্যু কি ঈসা মসীহকে ধরে রাখতে পেরেছিল?”

মৃত্যু কি ঈসা মসীহকে ধরে রাখতে পেরেছিল?

যদি তিনি জীবিত না হতেন, তবে কি হতো?

প্রিয় পাঠক, আগের লেখায় (ক্রুশীয় মৃত্যু ও তার ঐতিহাসিক প্রমাণ) -এ আমরা দেখেছি কীভাবে ঈসা মসীহ ক্রুশের ওপর সমস্ত মানবজাতির গুনাহর কাফফারা দিয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁর শেষ কথা ছিল "তেতেলেস্তাই" অর্থাৎ "সম্পন্ন হলো।" গুনাহর ঋণ পরিশোধিত হয়ে গেছে।

কিন্তু এখানেই একটু থামুন এবং গভীর ভাবে ভাবুন। পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক মহান মানুষ তাঁদের বিশ্বাসের জন্য প্রাণ দিয়েছেন। তাঁরা শহীদ হয়েছেন। কিন্তু তাঁদের কেউই মৃত্যুর পর আবার জীবিত হয়ে ওঠেননি।

ঈসা মসীহর ক্ষেত্রে গল্পটি ভিন্ন। তিনি শুধু মৃত্যুবরণ করেননি, তিনি তৃতীয় দিনে মৃত্যু থেকে জীবিত হয়ে উঠেছিলেন। আর এই একটি মাত্র ঘটনাই সবকিছু বদলে দিয়েছে।

ইঞ্জিল শরীফ-এর লেখক পৌল অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন:

"মসীহ যদি জীবিত হয়ে না উঠে থাকেন, তাহলে আমাদের প্রচার বৃথা এবং তোমাদের ঈমানও বৃথা।"
(ইঞ্জিল শরীফ (১ করিন্থীয়), ১ করিন্থীয় ১৫:১৪ আয়াত)

পৌল নিজেই বলছেন, পুনরুত্থান যদি সত্য না হয়, তাহলে পুরো খ্রীষ্টীয় বিশ্বাসই মিথ্যা। ভাল করে লক্ষ্য করুন, তিনি লুকানোর চেষ্টা করেননি বরং তিনি পুরো বিশ্বাসকে একটি মাত্র ঘটনার ওপর দাঁড় করিয়েছেন: পুনরুত্থান। যদি এটি সত্য হয়, তাহলে সবকিছু সত্য। যদি মিথ্যা হয়, তাহলে সবকিছু মিথ্যা।

কি কিছু কি কাজ করছে মাথায়? তাহলে আসুন, ঐতিহাসিক প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য এবং যুক্তির আলোকে পরীক্ষা করি: ঈসা মসীহ কি সত্যিই মৃত্যু থেকে জীবিত হয়ে উঠেছিলেন, নাকি এই দাবিটি মিথ্যা?

প্রথমত: তিনি কি সত্যিই মারা গিয়েছিলেন?

পুনরুত্থান প্রমাণ করার আগে, আমাদের প্রথমে নিশ্চিত হতে হবে যে ঈসা মসীহ সত্যিই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। কেউ কেউ বলেন, "তিনি হয়তো মারা যাননি, শুধু অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন" (Swoon Theory)।

কিন্তু এই দাবিটি ঐতিহাসিক ও চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক প্রমাণের আলোকে সম্পূর্ণ অসম্ভব। কারণ:

চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক প্রমাণ

Dr. William Edwards এবং তাঁর সহকর্মীরা Journal of the American Medical Association (JAMA) এ ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে (JAMA, Vol. 255, No. 11, পৃষ্ঠা ১৪৫৫-১৪৬৩) বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে:

প্রথমত, রোমান সৈনিকদের চাবুকের আঘাতে তাঁর পিঠের চামড়া ও মাংস ছিঁড়ে গিয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, ক্রুশে হাত ও পায়ে পেরেক ঠোকা হয়েছিল।

তৃতীয়ত, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্রুশে ঝুলে থাকার কারণে শ্বাসকষ্ট (asphyxiation) হয়েছিল।

চতুর্থত, মৃত্যু নিশ্চিত করতে একজন রোমান সৈন্য তাঁর পাঁজরে বর্শা দিয়ে খোঁচা দিয়েছিল এবং রক্ত ও পানি বেরিয়ে এসেছিল।

ইঞ্জিল শরীফ এই শেষ ঘটনাটি বিশেষভাবে লিপিবদ্ধ করেছে:

"কিন্তু একজন সৈন্য বর্শা দিয়ে তাঁর পাঁজরে খোঁচা দিলো, আর সাথে সাথে রক্ত ও পানি বেরিয়ে এলো।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ১৯:৩৪ আয়াত)

চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে, রক্ত ও পানি আলাদাভাবে বের হওয়া প্রমাণ করে যে হৃদপিণ্ডের চারপাশের পেরিকার্ডিয়াল থলি (pericardial sac) ফেটে গিয়েছিল। এটি নিশ্চিত মৃত্যুর লক্ষণ। ইউহোন্না যখন এই ঘটনা লিখেছিলেন, তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞান জানতেন না। তিনি শুধু যা দেখেছিলেন তা লিখেছিলেন। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান তাঁর বর্ণনাকে সম্পূর্ণ সত্য বলে নিশ্চিত করেছে।

রোমান সৈন্যদের পেশাদারিত্ব

রোমান সৈন্যরা ছিল পেশাদার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী। একজন বন্দীকে জীবিত রেখে দেওয়া মানে সেই সৈন্যের নিজের মৃত্যুদণ্ড। তাই তারা কখনো ভুল করতো না। ইঞ্জিল শরীফ বলছে, সৈন্যরা নিজেরাই নিশ্চিত করেছিল যে ঈসা মসীহ মারা গেছেন:

"সৈন্যরা এসে দেখলো ঈসা ইতিমধ্যেই মারা গেছেন, তাই তারা তাঁর পা ভাঙলো না।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ১৯:৩৩ আয়াত)

রোমান চাবুক, ক্রুশবিদ্ধকরণ, বর্শার আঘাত, রক্ত ও পানি বের হওয়া এবং পেশাদার রোমান সৈন্যদের নিশ্চিতকরণ। এতগুলো প্রমাণের পর "তিনি মারা যাননি" দাবি করা চিকিৎসা বিজ্ঞান ও ইতিহাসের সরাসরি বিরোধিতা।

দ্বিতীয়ত: খালি কবর, সবচেয়ে বড় প্রমাণ

ঈসা মসীহর মৃতদেহ একটি পাথরে কাটা নতুন কবরে রাখা হয়েছিল। কবরের মুখে একটি বিশাল পাথর গড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং রোমান সৈন্যরা পাহারা বসিয়েছিল:

"পিলাত বললেন, 'তোমাদের কাছে পাহারাদার আছে। যাও, যতটা পারো নিরাপত্তার ব্যবস্থা করো।' তারা গিয়ে পাথরের ওপর সিলমোহর দিয়ে এবং পাহারাদার বসিয়ে কবর নিরাপদ করলো।"
(ইঞ্জিল শরীফ, মথি ২৭:৬৫-৬৬ আয়াত)

কিন্তু তৃতীয় দিনে:

"সপ্তাহের প্রথম দিনে খুব ভোরে, যখন সূর্য উঠছিল, তারা (নারীরা) কবরের কাছে এলেন। তারা দেখলেন যে কবরের মুখ থেকে পাথরটি সরানো হয়েছে। কবরের ভেতরে ঢুকে তারা দেখলেন হযরত ঈসা মসীহের দেহ সেখানে নেই।"
(ইঞ্জিল শরীফ, লূক ২৪:১-৩ আয়াত)

কবর খালি ছিল। এটি এমন একটি ঐতিহাসিক সত্য যা ঈসা মসীহর বন্ধু ও শত্রু উভয়ই স্বীকার করেছে। কেউই দাবি করেনি যে কবরে দেহ আছে। বিতর্ক শুধু ছিল দেহ কোথায় গেল। ইহুদি ধর্মীয় নেতারা বলেছিলেন সাহাবীরা দেহ চুরি করেছে। কিন্তু এই দাবিটি কতটা যুক্তিসঙ্গত?

তৃতীয়ত: "দেহ চুরি" তত্ত্ব কেন অসম্ভব?

ইহুদি ধর্মীয় নেতারা দাবি করেছিলেন যে ঈসা মসীহর সাহাবীরা রাতে এসে দেহ চুরি করে নিয়ে গেছে (ইঞ্জিল শরীফ, মথি ২৮:১১-১৫)।

কিন্তু এই দাবি কয়েকটি কারণে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক:

প্রথমত, কবরে রোমান সৈন্যদের পাহারা ছিল। রোমান সৈন্যরা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ সেনাবাহিনী। পাহারায় ঘুমিয়ে পড়লে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো। একদল ভীত-সন্ত্রস্ত, পালিয়ে যাওয়া জেলে ও কৃষক কি পেশাদার রোমান সৈন্যদের পাহারা ভেঙে, একটি বিশাল পাথর সরিয়ে, দেহ চুরি করতে পারে?

দ্বিতীয়ত, ঈসা মসীহর সাহাবীরা তাঁর গ্রেপ্তারের সময় ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন (ইঞ্জিল শরীফ, মার্ক ১৪:৫০ আয়াত)। যারা ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন, তারা কি হঠাৎ সাহসী হয়ে রোমান সৈন্যদের সাথে লড়াই করে দেহ চুরি করবেন?

তৃতীয়ত, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: যদি সাহাবীরা জানতেন যে দেহ চুরি করা হয়েছে এবং পুনরুত্থান একটি মিথ্যা, তাহলে তারা কেন সেই মিথ্যার জন্য নিজেদের জীবন দিলেন? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে ঈসা মসীহর প্রায় প্রতিটি সাহাবী তাঁর পুনরুত্থানের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য শহীদ হয়েছেন।

মানুষ কখনো এমন কিছুর জন্য মরে না যা সে মিথ্যা বলে জানে। মানুষ মিথ্যার জন্য বাঁচতে পারে, কিন্তু মিথ্যার জন্য মরে না। যদি পুনরুত্থান মিথ্যা হতো, তাহলে অন্তত একজন সাহাবী মৃত্যুর ভয়ে সত্য স্বীকার করতেন। কিন্তু কেউই করেননি। প্রত্যেকেই শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন: "তিনি জীবিত হয়ে উঠেছেন!"

চতুর্থত: প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য

কিতাবুল মোকাদ্দস বলছে, পুনরুত্থিত ঈসা মসীহ অনেক মানুষের সামনে প্রকাশিত হয়েছিলেন। এটি কোনো একজনের ব্যক্তিগত দাবি নয়, এটি বহু প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য।

পৌল একটি তালিকা দিয়েছেন:

"মসীহ কিতাব অনুযায়ী আমাদের গুনাহের জন্য মরলেন, তাঁকে দাফন করা হলো এবং কিতাব অনুযায়ী তৃতীয় দিনে তিনি জীবিত হয়ে উঠলেন। তিনি কৈফাকে (পিতর) দেখা দিলেন, তারপর সেই বারোজনকে। তারপর একসাথে পাঁচশোরও বেশি ভাইকে দেখা দিলেন, যাদের বেশিরভাগ এখনো জীবিত আছেন... তারপর ইয়াকুবকে, তারপর সমস্ত প্রেরিতদের, আর সবশেষে আমাকেও দেখা দিলেন।"
(ইঞ্জিল শরীফ, ১ করিন্থীয় ১৫:৩-৮ আয়াত)

লক্ষ্য করুন, পৌল বলছেন ৫০০ জনেরও বেশি মানুষ একসাথে পুনরুত্থিত ঈসা মসীহকে দেখেছেন এবং তাদের বেশিরভাগ "এখনো জীবিত আছেন"। এটি অত্যন্ত সাহসী একটি দাবি। কারণ পৌল যখন এই চিঠি লিখেছিলেন (প্রায় ৫৫ খ্রীষ্টাব্দ), তখন এই প্রত্যক্ষদর্শীরা জীবিত ছিলেন। যে কেউ গিয়ে তাদের জিজ্ঞেস করতে পারতেন। কেউ যদি মিথ্যা বলতে চায়, সে কি এমন দাবি করবে যা শত শত জীবিত সাক্ষী দ্বারা সহজেই যাচাই করা যায়?

মরিয়ম মগ্দলিনীর সাক্ষ্য

সবার প্রথমে পুনরুত্থিত ঈসা মসীহ দেখা দিয়েছিলেন মরিয়ম মগ্দলিনীকে:

"ঈসা তাঁকে বললেন, 'মরিয়ম!' মরিয়ম ঘুরে দাঁড়িয়ে হিব্রু ভাষায় বললেন, 'রাব্বুনি!' (অর্থাৎ ওস্তাদ)।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ২০:১৬ আয়াত)

এখানে একটি ঐতিহাসিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করুন। প্রথম শতাব্দীর ইহুদি সমাজে নারীর সাক্ষ্য আদালতে গ্রহণযোগ্য ছিল না। যদি সাহাবীরা পুনরুত্থানের গল্প বানিয়ে থাকতেন, তাহলে তারা কখনো একজন নারীকে প্রথম সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করতেন না। তারা পিতর বা ইউহোন্নার মতো পুরুষ সাহাবীকে প্রথম সাক্ষী হিসেবে দেখাতেন। কিন্তু তারা সত্যটাই লিখেছেন, সত্য হলো একজন নারী প্রথম সাক্ষী ছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে তারা গল্প বানাননি, তারা যা ঘটেছিল তা-ই লিখেছেন।

সন্দেহবাদী থোমার সাক্ষ্য

সাহাবী থোমা প্রথমে পুনরুত্থানে বিশ্বাস করেননি। তিনি বলেছিলেন:

"আমি তাঁর হাতে পেরেকের দাগ না দেখলে এবং সেই দাগে আমার আঙুল না দিলে এবং তাঁর পাঁজরে আমার হাত না দিলে আমি বিশ্বাস করব না।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ২০:২৫ আয়াত)

আট দিন পর ঈসা মসীহ তাঁর সামনে দাঁড়ালেন এবং বললেন:

"থোমা, তোমার আঙুল এখানে রাখো এবং আমার হাত দেখো। তোমার হাত বাড়াও এবং আমার পাঁজরে দাও। সন্দেহ করো না, বরং বিশ্বাস করো।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ২০:২৭ আয়াত)

থোমা তখন বলে উঠলেন:

"আমার মনিব ও আমার আল্লাহ!"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ২০:২৮ আয়াত)

একজন সাহাবী কিন্তু কঠোর সন্দেহবাদী যিনি কিনা ঈসা মসীহের সাথে এতোদিন ঘুরেছেন, তাঁর কাজ দেখেছেন, তিনিই, যিনি হাতে-কলমে প্রমাণ না পেলে বিশ্বাস করবেন না বলেছিলেন, তিনি নিজে পুনরুত্থিত ঈসা মসীহকে দেখে ও স্পর্শ করে "আমার আল্লাহ" বলে স্বীকার করলেন। পরবর্তীতে ঐতিহ্য অনুসারে থোমা ভারতে গিয়ে সুসংবাদ প্রচার করেছিলেন এবং সেখানেই শহীদ হয়েছিলেন। একজন সন্দেহবাদী কি মিথ্যার জন্য বিদেশে গিয়ে প্রাণ দেন?

পঞ্চমত: সাহাবীদের জীবনের আমূল পরিবর্তন

পুনরুত্থানের সবচেয়ে শক্তিশালী পরোক্ষ প্রমাণ হলো সাহাবীদের জীবনের সম্পূর্ণ পরিবর্তন।

ক্রুশের আগে এই সাহাবীরা ছিলেন ভীত, পলাতক এবং হতাশ। পিতর তিনবার ঈসা মসীহকে অস্বীকার করেছিলেন ভয়ে (ইঞ্জিল শরীফ, লূক ২২:৫৪-৬২)। বাকি সবাই পালিয়ে গিয়েছিলেন।

কিন্তু পুনরুত্থানের পর এই একই মানুষগুলো সম্পূর্ণ বদলে গেলেন। তারা নির্ভয়ে জেরুজালেমের রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঘোষণা করতে লাগলেন:

"তোমরা এই ঈসাকে ক্রুশে দিয়ে হত্যা করেছ। কিন্তু আল্লাহ মৃত্যুর যন্ত্রণা থেকে তাঁকে মুক্ত করে জীবিত করেছেন, কারণ মৃত্যুর পক্ষে তাঁকে ধরে রাখা সম্ভব ছিল না।"
(ইঞ্জিল শরীফ, প্রেরিত ২:২৩-২৪ আয়াত)

আসলে কী ঘটেছিল, এই কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যে ভীত, পলাতক মানুষগুলো সিংহের মতো সাহসী হয়ে উঠলেন? তারা মার খেলেন, জেলে গেলেন, নির্যাতিত হলেন, কিন্তু একজনও পিছু হটলেন না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে প্রায় প্রতিটি সাহাবী শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছেন। কোনো মিথ্যা বা বানানো গল্প মানুষের মধ্যে এমন পরিবর্তন আনতে পারে না। তারা নিজেদের চোখে দেখেছিলেন যে ঈসা মসীহ জীবিত, তাই তারা মৃত্যুকে ভয় পাননি।

ষষ্ঠত: বাইরের ঐতিহাসিক সাক্ষ্য

শুধু কিতাবুল মোকাদ্দস নয়, বাইরের ঐতিহাসিক উৎসগুলোও পুনরুত্থানের পরোক্ষ প্রমাণ দেয়।

ইহুদি ঐতিহাসিক জোসেফাস

ফ্লেভিয়াস জোসেফাস তাঁর গ্রন্থ "Antiquities of the Jews" (Book XVIII, Chapter 3.3) এ লিখেছেন:

"পিলাত তাঁকে ক্রুশে দণ্ডিত করেছিলেন... যারা তাঁকে ভালোবাসতেন তারা তাঁকে ত্যাগ করেননি। কারণ তিনি তৃতীয় দিনে জীবিত হয়ে তাদের সামনে দেখা দিয়েছিলেন।"

রোমান গভর্নর প্লিনি

প্লিনি দ্য ইয়ংগার (১১২ খ্রীষ্টাব্দ, Letters, Book X, Letter 96) জানিয়েছেন যে খ্রীষ্টানরা ঈসা মসীহকে "ঈশ্বরের মতো করে প্রতি গান গেয়ে" উপাসনা করতো। মৃত একজন নবীর প্রতি কেউ ঈশ্বরের মতো উপাসনা করে না, যদি না তারা নিশ্চিত হয় যে তিনি জীবিত আছেন।

খ্রীষ্টধর্মের বিস্ফোরণমূলক বিস্তার

পুনরুত্থানের সবচেয়ে বড় পরোক্ষ প্রমাণ হলো খ্রীষ্টধর্মের অবিশ্বাস্য বিস্তার। ঈসা মসীহর মৃত্যুর মাত্র কয়েক দশকের মধ্যেই রোমান সাম্রাজ্যের সর্বত্র তাঁর অনুসারীরা ছড়িয়ে পড়েছিলেন। একজন ক্রুশবিদ্ধ ইহুদি রাব্বির শিক্ষা কীভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যকে জয় করলো, যদি না পুনরুত্থান সত্য হয়ে থাকে?

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ N.T. Wright (University of St Andrews) তাঁর গ্রন্থ "The Resurrection of the Son of God" (Fortress Press, 2003, পৃষ্ঠা ৭১০) এ লিখেছেন:

"পুনরুত্থান ছাড়া প্রাথমিক খ্রীষ্টধর্মের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করা ঐতিহাসিকভাবে অসম্ভব।"

সপ্তমত: কুরআন শরীফ কী বলে?

কুরআন শরীফে ঈসা মসীহর মৃত্যু নিয়ে একটি আয়াত আছে যা প্রায়ই উদ্ধৃত করা হয়:

"তারা তাঁকে হত্যা করেনি এবং ক্রুশবিদ্ধও করেনি, বরং তাদের কাছে এমনটি মনে হয়েছিল।"
(সূরা আন-নিসা, ৪:১৫৭ আয়াত)

এই আয়াতের ব্যাখ্যা নিয়ে মুসলিম পণ্ডিতদের মধ্যেও মতভেদ আছে। কিন্তু কুরআনের আরেকটি আয়াতে ঈসা মসীহ নিজেই বলেছেন:

"আমার ওপর শান্তি যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন আমি মৃত্যুবরণ করব এবং যেদিন আমি জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হব।"
(সূরা মরিয়ম, ১৯:৩৩ আয়াত)

এই আয়াতে তিনটি ঘটনার কথা বলা হয়েছে: জন্ম, মৃত্যু এবং পুনরুত্থান। কুরআন নিজেই ঈসা মসীহর মুখ দিয়ে মৃত্যু ও পুনরুত্থানের কথা বলাচ্ছে। এটি কি কিতাবুল মোকাদ্দসের বর্ণনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়?

সুতরাং, খালি কবর আজও কথা বলছে

প্রিয় পাঠক, আজকে আমরা দেখেছি:

প্রথমত, চিকিৎসা বিজ্ঞান ও ঐতিহাসিক প্রমাণ নিশ্চিত করে যে ঈসা মসীহ সত্যিই মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

দ্বিতীয়ত, কবর খালি ছিল, এটি বন্ধু ও শত্রু উভয়েই স্বীকার করেছে।

তৃতীয়ত, "দেহ চুরি" তত্ত্ব যুক্তি ও ইতিহাসের আলোকে সম্পূর্ণ অসম্ভব।

চতুর্থত, ৫০০ জনেরও বেশি প্রত্যক্ষদর্শী তাঁকে পুনরুত্থিত অবস্থায় দেখেছেন।

পঞ্চমত, ভীত ও পলাতক সাহাবীরা পুনরুত্থানের পর সিংহের মতো সাহসী হয়ে উঠেছেন এবং এই সাক্ষ্যের জন্য প্রাণ দিয়েছেন।

ষষ্ঠত, বাইরের ঐতিহাসিক উৎসগুলোও পরোক্ষভাবে পুনরুত্থানকে সমর্থন করে।

সপ্তমত, কুরআন শরীফও ঈসা মসীহর মুখ দিয়ে মৃত্যু ও পুনরুত্থানের কথা বলাচ্ছে।

পুনরুত্থান যদি সত্য হয়, তাহলে এর মানে হলো: ঈসা মসীহ মৃত্যুকে পরাজিত করেছেন। তিনি সত্যিই কালিমাতুল্লাহ, আল্লাহর জীবন্ত কালাম। তাঁর ক্রুশীয় কুরবানি আল্লাহ গ্রহণ করেছেন। গুনাহর ঋণ সম্পূর্ণ পরিশোধিত। আর যে কেউ তাঁর ওপর ঈমান আনবে, সে-ও মৃত্যুকে জয় করবে এবং অনন্ত জীবন পাবে।

ঈসা মসীহ নিজেই বলেছিলেন:

"আমিই পুনরুত্থান ও জীবন। যে আমার ওপর ঈমান আনে সে মরে গেলেও জীবিত হবে। আর যে জীবিত আছে ও আমার ওপর ঈমান আনে সে কখনো মরবে না। তুমি কি এটা বিশ্বাস করো?"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ১১:২৫-২৬ আয়াত)

প্রিয় পাঠক, আপনার জন্য একটি প্রশ্ন

ঈসা মসীহ আপনাকে আজ একটি প্রশ্ন করছেন, ঠিক যেমনটি তিনি ২,০০০ বছর আগে মার্থাকে করেছিলেন:

"তুমি কি এটা বিশ্বাস করো?"

তিনি আপনার গুনাহর জন্য মরেছেন। তিনি আপনার নাজাতের প্রমাণ হিসেবে মৃত্যু থেকে জীবিত হয়ে উঠেছেন। তাঁর খালি কবর আজও দাঁড়িয়ে আছে সাক্ষ্য দিতে যে মৃত্যু তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি।

প্রশ্ন হলো, আপনি কি এই সত্যকে গ্রহণ করবেন? নাকি এড়িয়ে যাবেন?

"কারণ গুনাহের বেতন হলো মৃত্যু, কিন্তু আল্লাহর দান হলো আমাদের মাবুদ ঈসা মসীহের মধ্য দিয়ে অনন্ত জীবন।"
(ইঞ্জিল শরীফ, রোমীয় ৬:২৩ আয়াত)

সম্পর্কিত বিষয়

সম্পর্কিত বিষয়গুলো আরো পড়ুন, জানুন

a person holding a bunch of keys in their hand
a person holding a bunch of keys in their hand
নাজাত ও কুরবানির ধারা

এই কিতাবের মূল বার্তা কী? কুরবানির রক্তের ধারা কোন মহাসত্যের দিকে ইঙ্গিত করে?

বিস্তারিত পড়ুন

তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব

কুরআন শরীফ কি কিতাবুল মোকাদ্দসকে সত্যায়ন করে? তাহরীফ তত্ত্বের ঐতিহাসিক

বিস্তারিত পড়ুন

ঈসা মসীহের অনন্য পরিচয়

এই কিতাব যাঁর কথা বলছে, তিনি কে? কেন তাঁকে কালিমাতুল্লাহ বলা হয়েছে? বিস্তারিত পড়ুন

বিস্তারিত পড়ুন

অথবা হোম পেজে ফিরে যানঃ