বার্নাবাসের ইঞ্জিল:
আসল ইঞ্জিল শরীফ, নাকি মধ্যযুগের জালিয়াতি?
একটি বই যা অনেকের বিশ্বাসের ভিত্তি, কিন্তু কেউ কি এর ইতিহাস জানে?


আপনি হয়তো শুনেছেন বা পড়েছেন যে "বার্নাবাসের ইঞ্জিলই আসল ইঞ্জিল" এবং "এটি প্রমাণ করে যে ঈসা মসীহ ক্রুশে মারা যাননি।" এই দাবিটি বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। অনেক বই, ওয়েবসাইট এবং ভিডিওতে এই দাবি করা হয়।
তবে, যদি আপনি এটি আগে থেকেই জানেন, তাহলে আপনি কি কখনো নিজেকে এই প্রশ্নগুলো করেছেন?
বার্নাবাসের ইঞ্জিল কবে লেখা হয়েছিল? কোন ভাষায়? কার দ্বারা? এর সবচেয়ে পুরনো পাণ্ডুলিপি কোথায়? এটি কি সত্যিই প্রথম শতাব্দীর লেখা? কোনো প্রাচীন খ্রীষ্টান, ইহুদি বা মুসলিম পণ্ডিত কি কখনো এই বইটির কথা উল্লেখ করেছেন?
যদি আপনি কখনো এই প্রশ্নের উত্তরগুলো না খুঁজে থাকেন, বা খুঁজেও না পেয়ে থাকেন, তবে আজকে আমরা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজব। আমরা আবেগকে দুরে কোথাও সরিয়ে দিয়ে শুধুমাত্র, ঐতিহাসিক দলিল, ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ দিয়ে বিচার করব।
কারন, আমাদের উদ্দেশ্য কাউকে আঘাত করা নয়। বরং আমাদের উদ্দেশ্য হলো, সেই সত্যকে উন্মোচন করা। কারণ আপনার নাজাত একটি জাল বইয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে না। আপনার নাজাত নির্ভর করতে হবে আল্লাহর সত্য কালামের ওপর।
তাই চলুন তাহলে শুরু করি।
প্রথমত: বার্নাবাসের ইঞ্জিল কী?
"বার্নাবাসের ইঞ্জিল" (Gospel of Barnabas) হলো একটি বই যা দাবি করে এটি ঈসা মসীহের সাহাবী বার্নাবাস কর্তৃক লেখা। এই বইটিতে দাবি করা হয়েছে:
ক. ঈসা মসীহ ক্রুশে মারা যাননি, তাঁর জায়গায় ইয়াহুদা ইস্কারিওতকে ক্রুশে দেওয়া হয়েছিল।
খ. ঈসা মসীহ আল্লাহর পুত্র নন, তিনি শুধুই একজন নবী।
গ. মুহাম্মদ (সা.) হলেন শেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী এবং ঈসা মসীহ নিজেই তাঁর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।
এই দাবিগুলোর কারণে অনেক মুসলিম এই বইটিকে "আসল ইঞ্জিল" বলে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু ঐতিহাসিক প্রমাণ কী বলে?
দ্বিতীয়ত: পাণ্ডুলিপির ইতিহাস, সবচেয়ে বড় সমস্যা
যেকোনো প্রাচীন বইয়ের সত্যতা যাচাই করার প্রথম ধাপ হলো এর পাণ্ডুলিপির ইতিহাস পরীক্ষা করা। আমরা আমাদের আর্টিকেল "প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ও পাঠ্য-সমালোচনা" তে দেখেছি যে কিতাবুল মোকাদ্দস-এর ২৫,০০০টিরও বেশি প্রাচীন পাণ্ডুলিপি আছে, যার মধ্যে সবচেয়ে পুরনোটি ঈসা মসীহের সময়ের মাত্র ২৫-৫০ বছর পরের।
এখন দেখি বার্নাবাসের ইঞ্জিলের পাণ্ডুলিপির অবস্থা কী:
ক. মাত্র দুটি পাণ্ডুলিপি পৃথিবীতে আছে
পুরো পৃথিবীতে বার্নাবাসের ইঞ্জিলের মাত্র দুটি পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেছে:
১. ইতালীয় পাণ্ডুলিপি: এটি ইতালীয় ভাষায় লেখা এবং বর্তমানে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনার Österreichische Nationalbibliothek (Austrian National Library) তে সংরক্ষিত আছে (Codex 2662)। পণ্ডিতরা এই পাণ্ডুলিপিটিকে ১৫শ থেকে ১৭শ শতাব্দীর (১৫০০-১৭০০ খ্রীষ্টাব্দ) মধ্যে লেখা বলে নির্ধারণ করেছেন।
২. স্প্যানিশ পাণ্ডুলিপি: এটি স্প্যানিশ ভাষায় লেখা এবং বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার সিডনির Fisher Library (University of Sydney) তে সংরক্ষিত আছে। এই পাণ্ডুলিপিটি অসম্পূর্ণ এবং ইতালীয় পাণ্ডুলিপির অনুবাদ বলে মনে করা হয়।
তুলনা করুন: কিতাবুল মোকাদ্দসের ২৫,০০০+ প্রাচীন পাণ্ডুলিপি আছে, যার মধ্যে অনেকগুলো প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীর। বার্নাবাসের ইঞ্জিলের মাত্র ২টি পাণ্ডুলিপি আছে, যার কোনোটিই ১৫শ শতাব্দীর আগের নয়! যদি এটি সত্যিই প্রথম শতাব্দীর "আসল ইঞ্জিল" হতো, তাহলে ১,৪০০ বছরে আর একটিও কপি কোথাও পাওয়া গেল না কেন?
খ. প্রাচীন তালিকায় বাতিল বই হিসেবে উল্লেখ এবং একটি ঐতিহাসিক বিভ্রান্তি
প্রথম শতাব্দী থেকে ১৫শ শতাব্দী পর্যন্ত কোনো খ্রীষ্টান, ইহুদি বা মুসলিম লেখক, ঐতিহাসিক বা পণ্ডিত "বার্নাবাসের ইঞ্জিল" কে কখনো গ্রহনযোগ্য কোনো বইয়ের তালিকায় উল্লেখ করেননি।
এমনকি প্রথম শতাব্দীর চার্চ ফাদাররা (যেমন: Clement of Rome, Ignatius of Antioch, Polycarp, Irenaeus, Tertullian, Origen) অনেক গ্রন্থ ও চিঠিপত্র লিখেছেন যেখানে তাঁরা বিভিন্ন ইঞ্জিল ও ধর্মগ্রন্থের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কেউই "বার্নাবাসের ইঞ্জিল" কে গ্রহনযোগ্য বা বিশ্বাসযোগ্য পুস্তকের তালিকায় রাখেন নি।
এমনকি ৫ম শতাব্দীতে পোপ গেলাসিয়াস (Pope Gelasius I, ৪৯২-৪৯৬ খ্রীষ্টাব্দ) একটি তালিকা তৈরি করেছিলেন (Decretum Gelasianum) যেখানে গ্রহণযোগ্য ও অগ্রহণযোগ্য বইগুলোর নাম ছিল। সেখানে "বার্নাবাসের ইঞ্জিল" (Gospel in the name of Barnabas) এর উল্লেখ আছে বর্জনীয় ও অপোক্রিফা (Apocrypha) এর তালিকায়, কিন্তু, আশ্চর্যের বিষয় হলো যে, ৫ম/৬ষ্ঠ শতাব্দীতে প্রাচীন খ্রীষ্টীয় জগতে апокриф (অপ্রমাণিত বা বর্জনীয়) হিসেবে Gospel in the name of Barnabas নামে একটি বইয়ের অস্তিত্বের উল্লেখ পাওয়া গেলেও বাস্তবে এই প্রাচীন বইটি ইতিহাসের পাতা থেকে সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে এবং তার কোনো মূল কপি বা পাঠ্য রূপ বর্তমানে টিকে নেই। আবার, আজকে আমরা বাজারে বা ইন্টারনেটে যে 'বার্নাবাসের ইঞ্জিল' (Gospel of Barnabas) দেখতে পাই, সেটি একটি চতুর্দশ বা পঞ্চদশ শতাব্দীর (১৪ শতক) ইতালীয় ভাষায় লেখা পাণ্ডুলিপি।
অনেকে এই নাম দেখেই দাবি করেন, "দেখুন, ৫ম শতাব্দীতে এই বইটি ছিল!" কিন্তু এখানে একটি ঐতিহাসিক সত্য জানা অত্যন্ত জরুরি: পণ্ডিতরা একমত যে, ৫ম শতাব্দীর ওই তালিকায় উল্লেখিত বইটি এবং আজকে আমাদের হাতে থাকা ১৫শ শতাব্দীর ইতালীয় "বার্নাবাসের ইঞ্জিল" এক বই নয়।
ঐতিহাসিক ও ভাষাবিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, এটি মধ্যযুগের শেষভাগে লেখা হয়েছিল, কারণ:
৫ম শতাব্দীতে বাতিল হওয়া ওই বইটির একটি পাতাও আজ পৃথিবীতে টিকে নেই। সেটি সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে।
আজকে আমাদের হাতে যে ইতালীয় বইটি আছে, তাতে ১৩০০ খ্রীষ্টাব্দের পোপ বনিফেসের ১০০ বছরের জুবিলি এবং ১৩২০ খ্রীষ্টাব্দের দান্তের (Dante) কবিতার হুবহু উল্লেখ আছে।
যদি আজকের ইতালীয় বইটিই সেই ৫ম শতাব্দীর একই বই হতো, তাহলে ৫ম শতাব্দীর একটি বইয়ে কীভাবে ১৩০০ খ্রীষ্টাব্দের পোপের কথা বা দান্তের কবিতার লাইন আসবে?
এর মানে হলো: ৫ম শতাব্দীতে "বার্নাবাসের ইঞ্জিল" নামে কোনো একটি জাল (Apocryphal) বই ছিল, যাকে খ্রীষ্টানরা বাতিল করেছিল। আর পরবর্তীতে (১৫শ বা ১৬শ শতাব্দীতে) কেউ একজন সেই পুরনো বাতিল বইয়ের নামটা ব্যবহার করে সম্পূর্ণ নতুন একটি বই লিখেছে, যেখানে সে ইচ্ছে করেই ইসলামি ধারণা এবং মধ্যযুগের ইউরোপীয় সংস্কৃতি মিশিয়ে দিয়েছে।
৫ম শতাব্দীর একটি বইয়ে কীভাবে ১৪শ শতাব্দীর ইউরোপীয় ইতিহাস থাকবে? এর একটিই উত্তর: মধ্যযুগের (১৫শ শতাব্দীর) কোনো ইউরোপীয় লেখক প্রাচীন সেই বাতিল বইটির নাম ব্যবহার করে সম্পূর্ণ নতুন একটি বই লিখেছিলেন। অর্থাৎ, আজকে যাকে "বার্নাবাসের ইঞ্জিল" বলা হয়, সেটি প্রথম শতাব্দীর তো নয়ই, এমনকি ৫ম শতাব্দীরও নয়। এটি মধ্যযুগের একটি প্রমাণিত জালিয়াতি।
গ. প্রথম যুগের মুসলিম পণ্ডিতরা কি এই বই জানতেন?
আমরা দেখলাম যে ৫ম শতাব্দীতে "বার্নাবাসের নামে ইঞ্জিল" নামে একটি বাতিল বইয়ের অস্তিত্ব ছিল, যদিও সেটি আজকের ইতালীয় বইটি নয়। কিন্তু আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: প্রথম যুগের মুসলিম পণ্ডিতরা কি এই বইটির কথা জানতেন?
উত্তর হলো: না।
ইসলামের প্রথম কয়েক শতাব্দীর কোনো মুসলিম পণ্ডিত, তাফসীরকার, হাদিস সংকলক বা ঐতিহাসিক "বার্নাবাসের ইঞ্জিল" নামে কোনো বইয়ের কথা তাঁদের লেখায় উল্লেখ করেননি। ইমাম আল-বুখারী (৮১০-৮৭০ খ্রীষ্টাব্দ), ইমাম মুসলিম (৮১৫-৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দ), ইমাম আবু হানিফা (৬৯৯-৭৬৭ খ্রীষ্টাব্দ), ইমাম মালিক (৭১১-৭৯৫ খ্রীষ্টাব্দ), ইমাম শাফেয়ী (৭৬৭-৮২০ খ্রীষ্টাব্দ), ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (৭৮০-৮৫৫ খ্রীষ্টাব্দ), আল-তাবারী (৮৩৯-৯২৩ খ্রীষ্টাব্দ), ইবনে তাইমিয়্যা (১২৬৩-১৩২৮ খ্রীষ্টাব্দ), ইবনে কাসীর (১৩০১-১৩৭৩ খ্রীষ্টাব্দ), কেউই এই বইটি সম্পর্কে কিছু লেখেননি।
এমনকি, যেসব মুসলিম পণ্ডিত খ্রীষ্টানদের সাথে ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁরাও কখনো "বার্নাবাসের ইঞ্জিল" এর কথা উল্লেখ করেননি। যেমন:
ইবনে হাযম (৯৯৪-১০৬৪ খ্রীষ্টাব্দ), যিনি "আল-ফাসল ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়া ওয়ান নিহাল" গ্রন্থে খ্রীষ্টধর্মের বিস্তারিত সমালোচনা করেছিলেন, তিনিও এই বইটির কথা জানতেন না।
আল-গাযালী (১০৫৮-১১১১ খ্রীষ্টাব্দ), যিনি ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ এবং যিনি অন্যান্য ধর্মের সাথে তুলনামূলক আলোচনা করেছিলেন, তিনিও এই বইটির কথা কখনো উল্লেখ করেননি।
এখানে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করুন:
প্রথমত, ৫ম শতাব্দীতে খ্রীষ্টানদের বাতিল বইয়ের তালিকায় "বার্নাবাসের ইঞ্জিল" নামে যে বইটি ছিল, সেটি যদি সত্যিই ইসলামের পক্ষে কিছু বলতো (যেমন আজকের ইতালীয় বইটি দাবি করে), তাহলে ইসলামের প্রথম কয়েক শতাব্দীর মুসলিম পণ্ডিতরা কি এটি খুঁজে বের করে ব্যবহার করতেন না? তাঁরা কি খ্রীষ্টানদের সাথে বিতর্কে এটি দেখাতেন না? কিন্তু কেউই করেননি। কারণ হয়তো সেই প্রাচীন বাতিল বইটিতে ইসলামের পক্ষে কিছুই ছিল না (এটি ছিল প্রাচীন একটি ভিন্ন ধরনের জাল রচনা), অথবা ততদিনে সেই বইটি সম্পূর্ণ হারিয়ে গিয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, আজকের ইতালীয় "বার্নাবাসের ইঞ্জিল" যদি সত্যিই ইসলামের প্রামাণ্য দলিল হতো, তাহলে এটি ১৫শ শতাব্দীর আগে কেন কোনো মুসলিম পণ্ডিতের কাছে পৌঁছালো না? কেন ইবনে হাযম, আল-গাযালী বা ইবনে তাইমিয়্যার মতো মহান পণ্ডিতরা এটি ব্যবহার করলেন না? কারণ এটি তখনো লেখাই হয়নি! এটি ১৫শ বা ১৬শ শতাব্দীতে কোনো ইউরোপীয় লেখক দ্বারা রচিত হয়েছে।
তাই আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি: ৫ম শতাব্দীর বাতিল তালিকায় থাকা "বার্নাবাসের ইঞ্জিল" এবং আজকের ইতালীয় "বার্নাবাসের ইঞ্জিল" সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি রচনা। প্রথমটি প্রাচীন একটি জাল রচনা যা হারিয়ে গেছে। দ্বিতীয়টি মধ্যযুগের একটি নতুন জালিয়াতি যা প্রাচীন বইটির নাম ব্যবহার করে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করেছে।
তৃতীয়ত: ভাষাগত প্রমাণ যা জালিয়াতি প্রমাণ করে
মধ্যযুগীয় নতুন এই বার্নাবাসের ইঞ্জিলের ভাষা ও বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করলে এমন অনেক ভুল ও অসঙ্গতি পাওয়া যায় যা প্রমাণ করে এটি মধ্যযুগে লেখা হয়েছে, প্রথম শতাব্দীতে নয়।
ক. ইতালীয় ভাষায় লেখা
বার্নাবাসের ইঞ্জিলের প্রধান পাণ্ডুলিপিটি ইতালীয় ভাষায় লেখা। প্রথম শতাব্দীতে ইসরাইলে কেউ ইতালীয় ভাষায় লিখতেন না। সেই সময়ে ব্যবহৃত ভাষা ছিল আরামীয়, হিব্রু ও গ্রিক। ইতালীয় ভাষা একটি রোমান্স ভাষা যা ল্যাটিন থেকে বিকশিত হয়েছে এবং মধ্যযুগে (১০ম-১৫শ শতাব্দী) তার বর্তমান রূপ লাভ করেছে।
একজন প্রথম শতাব্দীর ইসরাইলী সাহাবী কীভাবে ১৫শ শতাব্দীর ইতালীয় ভাষায় ইঞ্জিল লিখবেন? এটি ঠিক তেমনই অসম্ভব যেমন কেউ দাবি করে যে হযরত মুহাম্মদ (সা.) আধুনিক উর্দু ভাষায় কুরআন নাযিল করেছিলেন!
খ. মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় তথ্য
বার্নাবাসের ইঞ্জিলে এমন অনেক তথ্য আছে যা মধ্যযুগীয় ইউরোপের সাথে সম্পর্কিত, প্রথম শতাব্দীর ইসরাইলের সাথে নয়।
উদাহরণ ১: মদের পিপা (Wine Casks)
বার্নাবাসের ইঞ্জিলের ১৫২ নম্বর অধ্যায়ে মদ কাঠের পিপায় (wooden casks) রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রথম শতাব্দীর ইসরাইলে মদ রাখা হতো মাটির পাত্রে (clay jars) বা চামড়ার মশকে (wineskins), কাঠের পিপায় নয়। কাঠের পিপায় মদ রাখা মধ্যযুগীয় ইউরোপের রীতি ছিল।
আমরা আমাদের আর্টিকেল "প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ও ঐতিহাসিক সত্যতা" তে দেখেছি যে প্রত্নতত্ত্ব প্রথম শতাব্দীর ইসরাইলের জীবনযাত্রা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে। সেই তথ্যগুলোর সাথে বার্নাবাসের ইঞ্জিলের বর্ণনা মেলে না।
উদাহরণ ২: সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা (Feudalism)
বার্নাবাসের ইঞ্জিলের কিছু অংশে মধ্যযুগীয় ইউরোপের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার (feudal system) বর্ণনা পাওয়া যায়। প্রথম শতাব্দীর রোমান-শাসিত ইসরাইলে এই ব্যবস্থা ছিল না।
উদাহরণ ৩: দান্তের ডিভাইন কমেডি
সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রমাণ হলো, বার্নাবাসের ইঞ্জিলে জান্নাত ও জাহান্নামের যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা ইতালীয় কবি দান্তে আলিগিয়েরি (Dante Alighieri) এর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ "ডিভাইন কমেডি" (Divine Comedy, ১৩২০ খ্রীষ্টাব্দ) এর বর্ণনার সাথে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। দান্তে জান্নাতকে ৯টি স্তরে ভাগ করেছিলেন এবং বার্নাবাসের ইঞ্জিলেও ঠিক একই ধারণা পাওয়া যায়।
একটি প্রথম শতাব্দীর ইসরাইলী সাহাবীর লেখায় কীভাবে ১৪শ শতাব্দীর একজন ইতালীয় কবির ধারণা পাওয়া যাবে? উত্তর সহজ: বার্নাবাসের ইঞ্জিল প্রথম শতাব্দীতে লেখা হয়নি, এটি দান্তের "ডিভাইন কমেডি" এর পরে, অর্থাৎ ১৪শ শতাব্দীর পরে লেখা হয়েছে।
চতুর্থত: ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক ভুল যা জালিয়াতি প্রমাণ করে
ক. নাসরত একটি সমুদ্র বন্দর?
বার্নাবাসের ইঞ্জিলের ২০ নম্বর অধ্যায়ে বলা হয়েছে যে ঈসা মসীহ "নাসরত বন্দরে নৌকায় উঠলেন।" কিন্তু নাসরত কোনো সমুদ্র বন্দর নয়! নাসরত হলো গালীল অঞ্চলের একটি পাহাড়ি শহর, সমুদ্র থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে। যে কেউ প্রথম শতাব্দীর ইসরাইলে বাস করতেন বা সেখানে গিয়েছিলেন, তিনি জানতেন নাসরত সমুদ্রের ধারে নয়।
এই ভৌগোলিক ভুলটি প্রমাণ করে যে লেখক কখনো ইসরাইলে যাননি এবং প্রথম শতাব্দীর ভূগোল জানতেন না। একজন প্রকৃত সাহাবী কি তাঁর নিজের দেশের ভূগোল ভুল লিখবেন?
খ. "জুবিলি বছর" প্রতি ১০০ বছরে?
বার্নাবাসের ইঞ্জিলের ৮২ নম্বর অধ্যায়ে বলা হয়েছে যে "জুবিলি বছর" (Jubilee Year) প্রতি ১০০ বছরে আসে। কিন্তু তাওরাত শরীফ (লেবীয় পুস্তক) অনুযায়ী জুবিলি বছর আসে প্রতি ৫০ বছরে:
"তোমরা পঞ্চাশতম বছরকে পবিত্র করবে এবং দেশের সমস্ত বাসিন্দাদের জন্য মুক্তি ঘোষণা করবে।"
(তাওরাত শরীফ (লেবীয় পুস্তক), লেবীয় ২৫:১০ আয়াত)
তাহলে বার্নাবাসের ইঞ্জিলে ১০০ বছরের কথা কোথা থেকে এলো? উত্তর হলো: ক্যাথলিক চার্চের পোপ বনিফেস অষ্টম (Pope Boniface VIII) ১৩০০ খ্রীষ্টাব্দে প্রথমবার "হলি ইয়ার" বা জুবিলি বছর ঘোষণা করেছিলেন এবং সেটি প্রতি ১০০ বছরে পালন করার নিয়ম করেছিলেন।
বার্নাবাসের ইঞ্জিলে ১০০ বছরের জুবিলির কথা আছে, যা তাওরাত শরীফের ৫০ বছরের নিয়মের সাথে মেলে না, কিন্তু ১৩০০ খ্রীষ্টাব্দে পোপ বনিফেসের ঘোষণার সাথে হুবহু মেলে! এটি প্রমাণ করে যে বার্নাবাসের ইঞ্জিল ১৩০০ খ্রীষ্টাব্দের পরে লেখা হয়েছে।
পঞ্চমত: কুরআনের সাথে অসঙ্গতি
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, বার্নাবাসের ইঞ্জিল শুধু কিতাবুল মোকাদ্দস-এর সাথেই সাংঘর্ষিক নয়, এটি কুরআন শরীফের সাথেও সাংঘর্ষিক!
ক. ঈসা মসীহ কি মসীহ?
বার্নাবাসের ইঞ্জিলের ৯৬ নম্বর অধ্যায়ে ঈসা মসীহ বলেছেন: "আমি মসীহ নই।" কিন্তু কুরআন শরীফে বলা হয়েছে:
"তাঁর নাম মসীহ, ঈসা ইবনে মরিয়ম।"
(সূরা আলে ইমরান, ৩:৪৫ আয়াত)
কুরআন স্পষ্টভাবে বলছে ঈসা মসীহের নামই "মসীহ"। কিন্তু বার্নাবাসের ইঞ্জিল বলছে ঈসা মসীহ নন! বার্নাবাসের ইঞ্জিল কুরআনের বিরোধিতা করছে!
খ. মুহাম্মদ (সা.) কি মসীহ?
বার্নাবাসের ইঞ্জিল দাবি করে যে মুহাম্মদ (সা.) হলেন "মসীহ"। কিন্তু কোনো মুসলিম পণ্ডিতই মুহাম্মদ (সা.) কে "মসীহ" বলেন না। কুরআনে "মসীহ" উপাধি শুধুমাত্র ঈসা মসীহকে দেওয়া হয়েছে, মুহাম্মদ (সা.) কে নয়।
বার্নাবাসের ইঞ্জিল যদি ইসলামের পক্ষে লেখা হতো, তাহলে এটি কুরআনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো। কিন্তু এটি কুরআনের সাথেও সাংঘর্ষিক! এটি প্রমাণ করে যে লেখক ইসলাম সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখতেন না, তিনি ভাসাভাসা ধারণার ওপর ভিত্তি করে লিখেছেন।
গ. জান্নাতের স্তর
বার্নাবাসের ইঞ্জিলে জান্নাতকে ৯টি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। কিন্তু ইসলামিক ঐতিহ্য অনুযায়ী জান্নাতের স্তর সংখ্যা ভিন্ন (বিভিন্ন হাদিসে ৮টি দরজার কথা বলা হয়েছে)। ৯টি স্তরের ধারণাটি দান্তের "ডিভাইন কমেডি" থেকে নেওয়া।
ষষ্ঠত: পণ্ডিতদের মতামত
ক. মুসলিম পণ্ডিতদের মতামত
প্রখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত ও ঐতিহাসিক আব্বাস আল-আক্কাদ (Abbas Mahmoud al-Aqqad, ১৮৮৯-১৯৬৪) তাঁর গবেষণায় বার্নাবাসের ইঞ্জিলকে মধ্যযুগীয় রচনা বলে মত প্রকাশ করেছেন।
খ. পশ্চিমা পণ্ডিতদের মতামত
Jan Joosten (University of Strasbourg) তাঁর গবেষণাপত্র "The Gospel of Barnabas and the Diatessaron" (Harvard Theological Review, Vol. 95, No. 1, 2002, পৃষ্ঠা ৭৩-৯৬) এ দেখিয়েছেন যে বার্নাবাসের ইঞ্জিল ১৪শ শতাব্দীর পরে লেখা একটি মধ্যযুগীয় রচনা।
L. and L. Ragg, যাঁরা ১৯০৭ সালে বার্নাবাসের ইঞ্জিলের প্রথম ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেছিলেন (Oxford: Clarendon Press, 1907), তাঁরাও তাঁদের ভূমিকায় স্পষ্টভাবে লিখেছেন যে এটি একটি মধ্যযুগীয় জালিয়াতি।
মুসলিম ও অমুসলিম উভয় পণ্ডিতই একমত যে বার্নাবাসের ইঞ্জিল প্রথম শতাব্দীর লেখা নয়। এটি মধ্যযুগে, সম্ভবত একজন ইউরোপীয় মুসলিম ধর্মান্তরিত (convert) দ্বারা লেখা হয়েছে যিনি ইসলামের পক্ষে এবং খ্রীষ্টধর্মের বিপক্ষে একটি বই তৈরি করতে চেয়েছিলেন।
সপ্তমত: কে লিখেছিলেন এই বই?
পণ্ডিতদের মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত তত্ত্ব হলো, বার্নাবাসের ইঞ্জিল সম্ভবত একজন ইউরোপীয় মুসলিম ধর্মান্তরিত ব্যক্তি লিখেছিলেন যিনি খ্রীষ্টধর্ম থেকে ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন। আবার, কিছু পণ্ডিত মনে করেন তিনি হতে পারেন:
একজন স্প্যানিশ বা ইতালীয় মুসলিম যিনি ১৫শ-১৬শ শতাব্দীতে "মোরিস্কো" (Moriscos, স্পেনের মুসলিমরা যাদের জোরপূর্বক খ্রীষ্টান করা হয়েছিল) সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেন। তিনি খ্রীষ্টধর্মের মৌলিক শিক্ষা জানতেন (তাই ইঞ্জিলের বিন্যাস অনুসরণ করতে পেরেছিলেন), কিন্তু ইসলামের গভীর জ্ঞান ছিল না (তাই কুরআনের সাথে অসঙ্গতি রয়ে গেছে) এবং প্রথম শতাব্দীর ইসরাইলের ভূগোল ও সংস্কৃতি জানতেন না (তাই ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ভুল রয়ে গেছে)।
তাহলে, আপনার সত্যের ভিত্তিটিকে কোথায় রাখবেন?
প্রিয় পাঠক, আজকে আমরা বার্নাবাসের ইঞ্জিল সম্পর্কে যে প্রমাণগুলো দেখলাম সেগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরি:
প্রথমত, পুরো পৃথিবীতে মাত্র ২টি পাণ্ডুলিপি আছে, যার কোনোটিই ১৫শ শতাব্দীর আগের নয়।
দ্বিতীয়ত, ১,৪০০ বছর ধরে কোনো খ্রীষ্টান, ইহুদি বা মুসলিম পণ্ডিত এই বইটির কথা উল্লেখ করেননি।
তৃতীয়ত, বইটি ইতালীয় ভাষায় লেখা, যা প্রথম শতাব্দীতে ব্যবহৃত হতো না।
চতুর্থত, বইটিতে মধ্যযুগীয় ইউরোপের তথ্য (কাঠের মদের পিপা, সামন্ততন্ত্র, দান্তের ধারণা, ১০০ বছরের জুবিলি) রয়েছে।
পঞ্চমত, বইটিতে ভৌগোলিক ভুল আছে (নাসরত সমুদ্র বন্দর)।
ষষ্ঠত, বইটি কুরআনের সাথেও সাংঘর্ষিক (ঈসা মসীহ নন, মুহাম্মদ মসীহ)।
সপ্তমত, মুসলিম ও অমুসলিম উভয় পণ্ডিতই এটিকে মধ্যযুগীয় জালিয়াতি বলে মত দিয়েছেন।
প্রিয় পাঠক, আপনার নাজাত একটি জাল বইয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে না। আপনার নাজাত নির্ভর করতে হবে আল্লাহর সত্য কালামের ওপর। আমরা আমাদের আর্টিকেল "প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ও পাঠ্য-সমালোচনা" থেকে শুরু করে "কিতাব সংরক্ষণে ঐশ্বরিক প্রতিশ্রুতি" পর্যন্ত দেখেছি যে কিতাবুল মোকাদ্দস ২৫,০০০টিরও বেশি প্রাচীন পাণ্ডুলিপি দ্বারা সমর্থিত, ৯৯.৫% বিশুদ্ধ এবং ২,০০০ বছর ধরে অবিকৃত।
বার্নাবাসের ইঞ্জিলের মাত্র ২টি পাণ্ডুলিপি আছে, যা ১,৪০০ বছর ধরে কেউ জানতো না, যা ভৌগোলিক ভুলে ভরা এবং যা কুরআনের সাথেও সাংঘর্ষিক। আপনি কোনটির ওপর আপনার চিরকালের গন্তব্যের জন্য নির্ভর করবেন?
ঈসা মসীহ নিজেই বলেছিলেন:
"আর তোমরা সত্যকে জানবে এবং সেই সত্যই তোমাদের মুক্ত করবে।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ৮:৩২ আয়াত)
আপনার জন্য একটি প্রশ্ন
আপনি কি জানতেন যে বার্নাবাসের ইঞ্জিলের মাত্র ২টি পাণ্ডুলিপি পৃথিবীতে আছে এবং কোনোটিই ১৫শ শতাব্দীর আগের নয়?
আপনি কি জানতেন যে এই বইটি কুরআনের সাথেও সাংঘর্ষিক?
আপনি কি জানতেন যে প্রথম যুগের কোনো মুসলিম পণ্ডিতই এই বইটি সম্পর্কে কিছু জানতেন না?
এই তথ্যগুলো জানার পর, আপনি কি এখনো এই বইটিকে "আসল ইঞ্জিল" মনে করবেন? নাকি আপনি কিতাবুল মোকাদ্দসের ২৫,০০০টি প্রাচীন পাণ্ডুলিপি দ্বারা সমর্থিত সত্য ইঞ্জিল পড়ে দেখবেন?
"কারণ আল্লাহ দুনিয়াকে এতই মহব্বত করলেন যে তিনি তাঁর একমাত্র পুত্রকে দান করলেন, যেন যে কেউ তাঁর ওপর ঈমান আনে সে বিনষ্ট না হয়, বরং অনন্ত জীবন পায়।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ৩:১৬ আয়াত)
প্রিয় পাঠক, আমাদের লেখাগুলো পড়ার সময় আপনার মনে অনেক কিছু নিয়ে সংশয় বা প্রশ্নের উদয় হতে পারে, তাই যদি আপনার ক্ষেত্রেও এমনটি হয়, তবে আর দেরি না করে এখনই আমাদেরকে তা লিখে জানাতে পারেন; আমরা অবশ্যই আপনাকে যথাযথ সহযোগীতা করবো, ইনশাল্লাহ্।
আপনার মনের অনুভুতি পাঠান
আপনার পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আমরা কোনো বিতর্ক ছাড়াই অত্যন্ত সম্মানের সাথে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর প্রদান করি।
হোম-ব্লগ ও প্রবন্ধ-প্রশ্নোত্তর-সম্পদ-যোগাযোগ
যোগাযোগ
salam@alkalimatullah.org
গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা সম্পূর্ণ নিশ্চিত
© 2026 কালিমাতুল্লাহ-ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক সত্য অনুসন্ধান কেন্দ্র।
সত্য অনুসন্ধান করুন, কারণ সত্য আপনাকে মুক্ত করবে।