আল্লাহর কালামের ধারণা:
কুরআন ও কিতাবুল মোকাদ্দস কি একই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করছে?”

প্রিয় পাঠক, একটি শব্দ যা দুটি কিতাবকে সংযুক্ত করে

"কালাম" বা "বাণী" (Word)। এই শব্দটি ইসলাম ও খ্রীষ্টীয় বিশ্বাস উভয়েরই কেন্দ্রে অবস্থিত। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, অনেক মুসলিম ভাই-বোন জানেন না যে তাঁদের নিজেদের কুরআন শরীফে "আল্লাহর কালাম" সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তা কিতাবুল মোকাদ্দস-এর শিক্ষার সাথে বিস্ময়করভাবে মিলে যায়।

আজকে আমরা আপনাকে একটি সৎ সাহসী প্রশ্ন করতে চাই: কুরআন শরীফ ও কিতাবুল মোকাদ্দস কি "আল্লাহর কালাম" সম্পর্কে একই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করছে? ঈসা মসীহকে উভয় কিতাবই কালিমাতুল্লাহ বলেছে। কিন্তু এই উপাধির গভীরে কী লুকিয়ে আছে?

আমরা কোনো দাবি করব না। আমরা শুধু দুটি কিতাবের আয়াত পাশাপাশি রেখে আপনাকে দেখাব। তারপর আপনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিন।

তবে তার আগে আপনাকে একটি অনুরোধ করতে চাই: এই আর্টিকেলটি পড়ার সময় দয়া করে আপনার পূর্বধারণা (preconceptions) একপাশে রাখুন। শুধু আয়াতগুলো পড়ুন এবং নিজের আকল (বুদ্ধি) দিয়ে বিচার করুন।

প্রথমত: কুরআন শরীফে "আল্লাহর কালাম" কাকে বলা হয়েছে?

আসুন, সবার আগে দেখি কুরআন শরীফ "আল্লাহর কালাম" বা "কালিমাতুল্লাহ" কাকে বলেছে।

ক. ঈসা মসীহই আল্লাহর কালেমা

"ফেরেশতারা বললেন, হে মরিয়ম, আল্লাহ তোমাকে তাঁর পক্ষ থেকে একটি কালেমার সুসংবাদ দিচ্ছেন, যার নাম মসীহ, ঈসা ইবনে মরিয়ম; দুনিয়া ও আখেরাতে তিনি সম্মানিত এবং আল্লাহর ঘনিষ্ঠদের অন্তর্ভুক্ত।"
(সূরা আলে ইমরান, ৩:৪৫ আয়াত)

এখানে অত্যন্ত গভীরভাবে লক্ষ্য করুন:

প্রথমত, আল্লাহ তায়ালা মরিয়মকে একটি "কালেমার" (كلمة / Kalimah) সুসংবাদ দিচ্ছেন। এখানে "কালেমা" শব্দটি কোনো বই, কোনো বাণী বা কোনো বার্তা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়নি। এটি সরাসরি একটি ব্যক্তিকে বোঝাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, সেই কালেমার "নাম" হলো "মসীহ, ঈসা ইবনে মরিয়ম"। অর্থাৎ ঈসা মসীহ নিজেই সেই কালেমা। তিনি কোনো কালেমা বহন করে আনেননি, তিনি নিজেই কালেমা।

তৃতীয়ত, তিনি "দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মানিত"। এই কথা কুরআনে আর কোনো নবী সম্পর্কে বলা হয়নি।

খ. ঈসা মসীহ আল্লাহর কালেমা ও রূহ

আরেকটি আয়াতে কুরআন আরও স্পষ্ট করে বলেছে:

"মরিয়মের পুত্র মসীহ ঈসা কেবলমাত্র আল্লাহর রাসূল, তাঁর কালেমা যা তিনি মরিয়মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে একটি রূহ।"
(সূরা আন-নিসা, ৪:১৭১ আয়াত)

এই আয়াতটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে একই আয়াতে ঈসা মসীহকে তিনটি উপাধি দেওয়া হয়েছে: (১) আল্লাহর রাসূল, (২) আল্লাহর কালেমা, এবং (৩) আল্লাহর রূহ। কুরআনে আর কোনো নবীর ক্ষেত্রে এই তিনটি উপাধি একসাথে ব্যবহার করা হয়নি। কেন?

এখন একটু ভাবুন। আল্লাহর "কালেমা" এবং আল্লাহর "রূহ" এই দুটি আল্লাহর নিজস্ব গুণাবলি। কালাম মানে আল্লাহর বাক্, আল্লাহর প্রকাশ। রূহ মানে আল্লাহর প্রাণশক্তি, আল্লাহর সক্রিয় উপস্থিতি। যদি ঈসা মসীহ আল্লাহর কালেমা এবং আল্লাহর রূহ উভয়ই হন, তাহলে তিনি কি শুধুমাত্র একজন সাধারণ মানুষ বা সাধারণ নবী হতে পারেন?

গ. ইয়াহিয়া নবী (John the Baptist) ঈসা মসীহকে "আল্লাহর কালেমা" বলে সত্যায়ন করেছেন

কুরআন শরীফে ইয়াহিয়া নবী (যাকে কিতাবুল মোকাদ্দসে বাপ্তিস্মদাতা ইউহোন্না বলা হয়) সম্পর্কে বলা হয়েছে:

"অতঃপর যখন তিনি (যাকারিয়া) মিহরাবে দাঁড়িয়ে নামায পড়ছিলেন, ফেরেশতারা তাঁকে ডেকে বললেন, 'আল্লাহ তোমাকে ইয়াহিয়ার সুসংবাদ দিচ্ছেন, যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি কালেমার সত্যায়নকারী হবেন।'"
(সূরা আলে ইমরান, ৩:৩৯ আয়াত)

লক্ষ্য করুন, ইয়াহিয়া নবী নিজে "কালেমা" নন, তিনি হলেন "কালেমার সত্যায়নকারী"। অর্থাৎ ইয়াহিয়া নবীর কাজ ছিল সেই কালেমার (ঈসা মসীহের) আগমনকে ঘোষণা করা এবং তাঁকে সত্যায়ন করা। এটি ঠিক সেই সত্যই প্রকাশ করছে যা আমরা কিতাবুল মোকাদ্দসেও পড়ি:

"দেখো, আল্লাহর সেই মেষশাবক, যিনি দুনিয়ার গুনাহ বহন করে নিয়ে যান!"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন, ইউহোন্না ১:২৯ আয়াত)

ইয়াহিয়া নবী ঈসা মসীহকে দেখে এই কথা বলেছিলেন। কুরআন ও কিতাবুল মোকাদ্দস উভয়ই একমত যে ইয়াহিয়া নবীর মূল কাজ ছিল ঈসা মসীহকে চিহ্নিত ও সত্যায়ন করা।

দ্বিতীয়ত: কিতাবুল মোকাদ্দসে "আল্লাহর কালাম" কাকে বলা হয়েছে?

এখন দেখি কিতাবুল মোকাদ্দস "আল্লাহর কালাম" সম্পর্কে কী বলে।

ক. কালাম শুরু থেকেই আল্লাহর সাথে ছিলেন

"শুরুতে কালাম ছিলেন, সেই কালাম আল্লাহর সাথে ছিলেন এবং সেই কালাম নিজেই খোদা ছিলেন। তিনি শুরুতে আল্লাহর সাথে ছিলেন।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ১:১-২ আয়াত)

এখানে গ্রিক ভাষায় "কালাম" এর জন্য "লোগোস" (Λόγος / Logos) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। প্রাচীন গ্রিক দর্শনে "লোগোস" শুধু একটি শব্দ নয়, এটি হলো ঐশ্বরিক যুক্তি, ঐশ্বরিক প্রজ্ঞা, সেই চিরন্তন সত্তা যার মাধ্যমে আল্লাহ নিজেকে প্রকাশ করেন এবং সৃষ্টিজগতের সাথে যোগাযোগ করেন।

এখানে তিনটি গভীর সত্য প্রকাশিত হয়েছে:

১. "শুরুতে কালাম ছিলেন": কালাম সৃষ্ট নন, তিনি শুরু থেকেই বিদ্যমান ছিলেন। কালামের কোনো শুরু নেই।

২. "সেই কালাম আল্লাহর সাথে ছিলেন": কালাম আল্লাহ থেকে আলাদা নন, তিনি আল্লাহর সাথে ছিলেন। এটি আল্লাহর একটি নিজস্ব গুণ বা সত্তা।

৩. "সেই কালাম নিজেই খোদা ছিলেন": কালাম শুধু আল্লাহর সাথে ছিলেন না, তিনি নিজেই ঐশ্বরিক সত্তা।

এখন একটু ভাবুন। আল্লাহর কালাম কি সৃষ্ট হতে পারে? আল্লাহ কি কখনো কালামবিহীন ছিলেন? নিশ্চয়ই না। আল্লাহ যখন থেকে আছেন, তাঁর কালামও তখন থেকেই আছে। আল্লাহর কালাম আল্লাহর অবিচ্ছেদ্য অংশ, ঠিক যেমন সূর্যের আলো সূর্য থেকে আলাদা নয় কিন্তু সূর্যেরই অংশ।

খ. কালামের মাধ্যমে সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে

"তাঁর (কালামের) মাধ্যমে সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে; আর যা কিছু সৃষ্ট হয়েছে সেগুলোর মধ্যে কোন কিছুই তাঁকে ছাড়া সৃষ্ট হয় নি।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ১:৩ আয়াত)

এই আয়াতটি তাওরাত শরীফ এর সৃষ্টি বর্ণনার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। আমরা আমাদের আর্টিকেল "তাওরাত শরীফে মসীহের ছায়া: সৃষ্টির শুরু থেকেই আল্লাহ কার কথা বলে আসছিলেন?" তে দেখেছি যে আল্লাহ তাঁর কালামের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন:

"আল্লাহ বললেন, 'আলো হোক,' আর আলো হলো।"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ১:৩ আয়াত)

এখানে হিব্রু শব্দ "দাবার" (דָּבָר / Dabar) ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ "কালাম" বা "বাণী"। আল্লাহ তাঁর কালামের দ্বারা সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।

জবুর শরীফও এই সত্যের সাক্ষ্য দেয়:

"মাবুদের কালামের দ্বারা আসমানসমূহ সৃষ্টি হয়েছে এবং তাঁর মুখের ফুঁকে তাদের সমস্ত বাহিনী।"
(জবুর শরীফ (গীতসংহিতা), জবুর ৩৩:৬ আয়াত)

তাওরাত বলছে আল্লাহ কালামের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন। জবুর বলছে আসমানসমূহ কালামের দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে। ইঞ্জিল বলছে ঈসা মসীহ (কালাম) এর মাধ্যমে সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে। তিনটি কিতাব একই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করছে!

গ. কালাম মানুষ হয়ে পৃথিবীতে এলেন

"সেই কালাম মানুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করলেন এবং আমাদের মধ্যে বাস করলেন। আমরা তাঁর মহিমা দেখেছি, পিতার কাছ থেকে আসা একমাত্র পুত্রের মহিমা, অনুগ্রহ ও সত্যে পরিপূর্ণ।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ১:১৪ আয়াত)

এটিই সেই মহাসত্য যা কিতাবুল মোকাদ্দসের কেন্দ্রবিন্দু: আল্লাহর চিরন্তন কালাম মানুষের রূপ ধারণ করে পৃথিবীতে এসেছিলেন। তিনি আমাদের মাঝে বাস করেছিলেন। তিনি আমাদের দুঃখ অনুভব করেছিলেন, আমাদের ভাষায় কথা বলেছিলেন, আমাদের হাতে স্পর্শযোগ্য ছিলেন। আর তিনি হলেন ঈসা মসীহ।

তৃতীয়ত: দুটি কিতাবের তুলনা, পাশাপাশি রেখে দেখুন

এখন আসুন, কুরআন শরীফ ও কিতাবুল মোকাদ্দসএর আয়াতগুলো পাশাপাশি রেখে তুলনা করি:

তুলনা ১: ঈসা মসীহ কি আল্লাহর কালাম?

কুরআন বলছে:
"আল্লাহ তোমাকে তাঁর পক্ষ থেকে একটি কালেমার সুসংবাদ দিচ্ছেন, যার নাম মসীহ, ঈসা ইবনে মরিয়ম।"
(সূরা আলে ইমরান, ৩:৪৫ আয়াত)

কিতাবুল মোকাদ্দস বলছে:
"শুরুতে কালাম ছিলেন... সেই কালাম মানুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করলেন।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ১:১, ১:১৪ আয়াত)

উভয় কিতাবই ঈসা মসীহকে আল্লাহর "কালেমা" বা "কালাম" বলছে। এটি কি কাকতালীয়?

তুলনা ২: ঈসা মসীহ কি আল্লাহর রূহ?

কুরআন বলছে:
"মরিয়মের পুত্র মসীহ ঈসা... তাঁর পক্ষ থেকে একটি রূহ।"
(সূরা আন-নিসা, ৪:১৭১ আয়াত)

কিতাবুল মোকাদ্দস বলছে:
"পাক-রূহ তোমার ওপর আসবেন এবং আল্লাহ তায়ালার কুদরত তোমাকে ছায়া দেবেন।"
(ইঞ্জিল শরীফ, লূক ১:৩৫ আয়াত)

উভয় কিতাবই ঈসা মসীহকে আল্লাহর "রূহ" এর সাথে সরাসরি সম্পর্কিত করছে। এটিও কি কাকতালীয়?

তুলনা ৩: ঈসা মসীহ কি কুমারী মায়ের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছিলেন?

কুরআন বলছে:
"আমাকে কোনো মানুষ স্পর্শ করেনি এবং আমি ব্যভিচারিণীও নই, তাহলে কীভাবে আমার সন্তান হবে?"
(সূরা মরিয়ম, ১৯:২০ আয়াত)

কিতাবুল মোকাদ্দস বলছে:
"তাঁর মা মরিয়মের সাথে ইউসুফের বাগদান হয়েছিল, কিন্তু তাঁদের একসাথে হওয়ার আগেই দেখা গেল যে মরিয়ম পাক-রূহের কুদরতে গর্ভবতী হয়েছেন।"
(ইঞ্জিল শরীফ, মথি ১:১৮ আয়াত)

কুমারী মায়ের গর্ভে জন্ম, কুরআন ও কিতাবুল মোকাদ্দস উভয়ই একমত! দুটি ভিন্ন কিতাব, ভিন্ন সময়ে লেখা, কিন্তু একই সত্য বলছে!

তুলনা ৪: ঈসা মসীহ কি মৃত্যু থেকে জীবিত হয়ে উঠেছিলেন?

কুরআন বলছে (ঈসা মসীহর মুখে):
"আমার ওপর শান্তি যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন আমি মৃত্যুবরণ করব এবং যেদিন আমি জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হব।"
(সূরা মরিয়ম, ১৯:৩৩ আয়াত)

কিতাবুল মোকাদ্দস বলছে:
"তিনি (ঈসা মসীহ) কিতাব অনুযায়ী আমাদের গুনাহের জন্য মরলেন, তাঁকে দাফন করা হলো এবং কিতাব অনুযায়ী তৃতীয় দিনে তিনি জীবিত হয়ে উঠলেন।"
(ইঞ্জিল শরীফ, ১ করিন্থীয় ১৫:৩-৪ আয়াত)

কুরআন ঈসা মসীহর মুখ দিয়ে জন্ম, মৃত্যু ও পুনরুত্থান তিনটিই বলাচ্ছে! কিতাবুল মোকাদ্দসও একই তিনটি ঘটনা বর্ণনা করছে! আশ্চর্যজনক মিল!

চতুর্থত: আল্লাহর কালাম সম্পর্কে ইসলামিক ধর্মতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা

ইসলামিক ধর্মতত্ত্বে আল্লাহর কালামের প্রকৃতি নিয়ে শত শত বছর ধরে গভীর আলোচনা হয়েছে। ইসলামের ইতিহাসে "মু'তাজিলা" এবং "আশ'আরী" এই দুটি প্রধান ধারার মধ্যে একটি বিখ্যাত বিতর্ক ছিল:

মু'তাজিলা ধারার মত ছিল: আল্লাহর কালাম (কুরআন) সৃষ্ট (মাখলুক)। আল্লাহ এটি সৃষ্টি করেছেন।

আশ'আরী ও আহলে সুন্নাত ধারার মত ছিল (এবং আজও আছে): আল্লাহর কালাম অসৃষ্ট (গায়র মাখলুক)। আল্লাহর কালাম আল্লাহর একটি চিরন্তন গুণ (সিফাত)। আল্লাহ যখন থেকে আছেন, তাঁর কালামও তখন থেকেই আছে। আল্লাহর কালাম কখনো সৃষ্টি হয়নি।

এই বিতর্ক ইসলামের ইতিহাসে "খালকুল কুরআন" (কুরআনের সৃষ্টি) বিতর্ক নামে পরিচিত। আব্বাসীয় খলিফা আল-মা'মুন (রাজত্বকাল ৮১৩-৮৩৩ খ্রীষ্টাব্দ) মু'তাজিলা মতকে রাষ্ট্রীয় মত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং যারা আল্লাহর কালামকে "অসৃষ্ট" বলতেন তাঁদের নির্যাতন করেছিলেন। বিখ্যাত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) এই নির্যাতন সহ্য করেও দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন: আল্লাহর কালাম অসৃষ্ট।

এখন একটু ভাবুন। যদি ইসলামিক ধর্মতত্ত্বের মূলধারা (আহলে সুন্নাত) অনুযায়ী আল্লাহর কালাম অসৃষ্ট ও চিরন্তন হয়, এবং কুরআন যদি ঈসা মসীহকে আল্লাহর "কালেমা" বলে থাকে, তাহলে ঈসা মসীহর প্রকৃত সত্তা কী? তিনি কি একজন সৃষ্ট মানুষ মাত্র? নাকি তিনি আল্লাহর অসৃষ্ট কালামের মানবরূপ?

কিতাবুল মোকাদ্দস ঠিক এই সত্যটিই ঘোষণা করে:

"সেই কালাম মানুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করলেন এবং আমাদের মধ্যে বাস করলেন।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ১:১৪ আয়াত)

পঞ্চমত: "কালিমুল্লাহ" বনাম "কালিমাতুল্লাহ" পার্থক্যটি আবারও স্মরণ করি

আমরা আমাদের আর্টিকেল "কেন শুধুমাত্র ঈসা মসীহকেই কালিমাতুল্লাহ ও রুহুল্লাহ বলা হলো, আর কোনো নবীকে নয়?" তে এই পার্থক্যটি বিস্তারিত দেখেছি। এখানে সংক্ষেপে আবারও স্মরণ করি:

মূসা নবীকে বলা হয়েছে "কালিমুল্লাহ" (كليم الله) অর্থাৎ "যিনি আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন"। তিনি আল্লাহর কালামের শ্রোতা ও বহনকারী।

ঈসা মসীহকে বলা হয়েছে "কালিমাতুল্লাহ" (كلمة الله) অর্থাৎ "আল্লাহর কালাম"। তিনি কালামের শ্রোতা বা বহনকারী নন, তিনি নিজেই সেই কালাম।

মূসা নবী আল্লাহর কালাম "শুনেছিলেন" এবং মানুষকে "শুনিয়েছিলেন"। কিন্তু ঈসা মসীহ নিজেই সেই কালাম। এটি একটি বিশাল পার্থক্য, যা কুরআন ও কিতাবুল মোকাদ্দস উভয়ই স্বীকার করে।

ষষ্ঠত: আল্লাহর কালামের ক্ষমতা, সৃষ্টি থেকে মুক্তি পর্যন্ত

কিতাবুল মোকাদ্দস বলছে আল্লাহর কালাম শুধু তথ্য বা বাণী নয়, এটি একটি সক্রিয়, জীবন্ত ও ক্ষমতাশালী সত্তা:

"আল্লাহ্‌র কালাম জীবন্ত ও কার্যকর এবং দু’দিকেই ধার আছে এমন ছোরার চেয়েও ধারালো। এই কালাম মানুষের দিল-রূহ্‌ ও অসি'-মজ্জার গভীরে কেটে বসে এবং মানুষের দিলের সমস্ত ইচ্ছা ও চিন্তা পরীক্ষা করে দেখে। "
(ইঞ্জিল শরীফ, ইব্রীয় ৪:১২ আয়াত)

আল্লাহর কালাম কী কী করতে পারে? আসুন দেখি:

ক. সৃষ্টি করতে পারে: "আল্লাহ বললেন, 'আলো হোক,' আর আলো হলো" (তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ১:৩ আয়াত)। ঈসা মসীহও সৃষ্টি করেছেন, মাটি থেকে পাখি বানিয়ে প্রাণ দিয়েছেন (সূরা আলে ইমরান, ৩:৪৯ আয়াত)।

খ. রোগ সারাতে পারে: ঈসা মসীহ তাঁর কথায় (কালামে) জন্মান্ধকে দৃষ্টি দিয়েছেন, কুষ্ঠরোগীকে সুস্থ করেছেন।

গ. মৃতকে জীবিত করতে পারে: ঈসা মসীহ "লাসার, বেরিয়ে এসো!" বলেছেন এবং চার দিন আগে মৃত লাসার কবর থেকে জীবিত বেরিয়ে এসেছেন (ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ১১:৪৩ আয়াত)।

ঘ. প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে: ঈসা মসীহ "চুপ করো, স্থির হও!" বলেছেন এবং ঝড় থেমে গেছে (ইঞ্জিল শরীফ (মার্ক), মার্ক ৪:৩৯ আয়াত)।

ঙ. গুনাহ মাফ করতে পারে: 🟢 ঈসা মসীহ বলেছেন "তোমার গুনাহ মাফ করা হলো" (ইঞ্জিল শরীফ, মার্ক ২:৫ আয়াত)।

আল্লাহর কালাম যা যা করতে পারে, ঈসা মসীহ ঠিক তা-ই করেছেন। সৃষ্টি, সুস্থতা, জীবন দান, প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণ, গুনাহ মাফ, সবকিছু। কারণ তিনি নিজেই সেই কালাম।

তাহলে, দুটি কিতাব, একটি সত্য?

প্রিয় পাঠক, আজকে আমরা দেখলাম:

প্রথমত, কুরআন শরীফ ঈসা মসীহকে আল্লাহর "কালেমা" ও "রূহ" বলেছে, যা আর কোনো নবীকে বলা হয়নি।

দ্বিতীয়ত, কিতাবুল মোকাদ্দস বলছে আল্লাহর কালাম শুরু থেকেই আল্লাহর সাথে ছিলেন, তাঁর মাধ্যমে সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে এবং তিনি মানুষ হয়ে পৃথিবীতে এসেছেন।

তৃতীয়ত, দুটি কিতাবের তুলনায় দেখা যায়, ঈসা মসীহর কুমারী মায়ের গর্ভে জন্ম, কালিমাতুল্লাহ ও রুহুল্লাহ উপাধি, এবং মৃত্যু ও পুনরুত্থান সম্পর্কে দুটি কিতাবেই বিস্ময়কর মিল আছে।

চতুর্থত, ইসলামিক ধর্মতত্ত্বের মূলধারাই (আহলে সুন্নাত) স্বীকার করে যে আল্লাহর কালাম অসৃষ্ট ও চিরন্তন। আর কুরআন ঈসা মসীহকে সেই কালেমা বলেছে।

পঞ্চমত, ঈসা মসীহর কাজগুলো (সৃষ্টি, সুস্থতা, জীবন দান, প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণ, গুনাহ মাফ) প্রমাণ করে যে তিনি সত্যিই আল্লাহর জীবন্ত কালাম।

দুটি ভিন্ন কিতাব, ভিন্ন সময়ে লেখা, কিন্তু একটিই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করছে: ঈসা মসীহ হলেন আল্লাহর কালাম যিনি মানুষের রূপ ধারণ করে পৃথিবীতে এসেছিলেন। প্রশ্ন হলো, আপনি কি এই সত্যকে গ্রহণ করবেন?

পরবর্তী আর্টিকেলে আমরা দেখব নাজাতের ধারণা কিতাবুল মোকাদ্দস ও কুরআন শরীফে কীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

এখনই পড়ুন: "নাজাতের ধারণা: আল্লাহর অনুগ্রহ (Grace) বনাম মানুষের আমল (Works)"

আপনার জন্য একটি প্রশ্ন

আপনার নিজের কুরআন বলছে ঈসা মসীহ হলেন আল্লাহর "কালেমা" "রূহ"। আপনার কিতাবুল মোকাদ্দস বলছে সেই কালাম মানুষ হয়ে পৃথিবীতে এসেছেন।

দুটি কিতাবই একটি সত্যের দিকে ইঙ্গিত করছে। আপনি কি সেই সত্যকে দেখতে পাচ্ছেন?

"আর তোমরা সেই সত্যকে জানবে এবং সেই সত্য তোমাদের মুক্ত করবে।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ৮:৩২ আয়াত)

প্রিয় পাঠক, আমাদের লেখাগুলো পড়ার সময় আপনার মনে অনেক কিছু নিয়ে সংশয় বা প্রশ্নের উদয় হতে পারে, তাই যদি আপনার ক্ষেত্রেও এমনটি হয়, তবে আর দেরি না করে এখনই আমাদেরকে তা লিখে জানাতে পারেন; আমরা অবশ্যই আপনাকে যথাযথ সহযোগীতা করবো, ইনশাল্লাহ্।

আপনার মনের অনুভুতি পাঠান

আপনার পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আমরা কোনো বিতর্ক ছাড়াই অত্যন্ত সম্মানের সাথে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর প্রদান করি।

আমি কিতাবুল মোকাদ্দস পড়তে চাই, কিভাবে পেতে পারি?