নাজাতের ধারণা:

আল্লাহর অনুগ্রহ (Grace) বনাম মানুষের আমল (Works)

জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ‍দিয়ে শুরু করি

প্রিয় পাঠক, আমি আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে চাই। এই প্রশ্নটি শুনতে সহজ মনে হতে পারে, কিন্তু এর উত্তর আপনার চিরকালের সেই শেষ গন্তব্য নির্ধারণ করবে।

প্রশ্নটি হলো: আপনি কীভাবে নিশ্চিত হবেন যে আল্লাহ আপনাকে জান্নাত বা বেহেশত দেবেন?

বেশিরভাগ মানুষ বলবেন, "আমি নামাজ পড়ি, রোজা রাখি, যাকাত দিই, হজ করি, ভালো কাজ করি। আশা করি আল্লাহ আমাকে মাফ করবেন, ইত্যাদি ইত্যাদি।"

কিন্তু একটু গভীরে গিয়ে ভালভাবে খেয়াল করুন। আপনি বললেন "আশা করি।" খেয়াল করুন, আপনি কিন্তু বললেন না "আমি নিশ্চিত।" কিন্তু কেন? কারণ আপনার ভেতরে একটি অজানা অস্বস্তি আছে। আপনি জানেন না আপনার আমল যথেষ্ট কি না। আপনি জানেন না আল্লাহ আপনাকে মাফ করবেন কি না। আপনি জানেন না মৃত্যুর পর আপনার গন্তব্য কোথায়। এমনকি এই বেহেশত সম্পর্কে ভালভাল কথা শুনেছেন, কিন্তু ১০০% নিশ্চয়তায় কিভাবে পাবেন, তেমন গ্যারেন্টি কেউই দেখাতে পারে নি আপনাকে, আর তাই এই অস্বস্তি।

এই অনিশ্চয়তাই হলো মানবজাতির সবচেয়ে বড় সমস্যা। আর এই সমস্যার সমাধান লুকিয়ে আছে "নাজাত" (মুক্তি/salvation) এর ধারণায়। কিন্তু নাজাত কি মানুষের আমল দিয়ে অর্জন করা সম্ভব? নাকি এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ দান (অনুগ্রহ/Grace)?

আজকে আমরা এই প্রশ্নটি কিতাবুল মোকাদ্দস ও কুরআন শরীফের আলোকে গভীরভাবে পরীক্ষা করব। আমরা দেখব দুটি কিতাবই এই বিষয়ে কী বলে এবং সত্যটি কোথায় লুকিয়ে আছে।

person standing on brown and black welcome printed floor mat
person standing on brown and black welcome printed floor mat

প্রথমত: আমল দিয়ে নাজাত কেন সম্ভব নয়? কিতাবুল মোকাদ্দসের শিক্ষা

আমরা আমাদের আর্টিকেল ("আদি পাপ ও মানবজাতির পতন: গুনাহ কীভাবে আমাদের ও আল্লাহর মধ্যে দেয়াল তুলে দিলো?") তে বিস্তারিত দেখেছি যে আদমের গুনাহর মধ্য দিয়ে সমস্ত মানবজাতির মধ্যে গুনাহর স্বভাব প্রবেশ করেছে।

কিন্তু এখন আমরা আরও গভীরে যাব। কেন আমল দিয়ে নাজাত সম্ভব নয়? আসুন কয়েকটি যুক্তি ও আয়াত দিয়ে বিষয়টিকে ভালভাবে বুঝার চেষ্টা করি।

ক. কারণ আল্লাহর মান (Standard) অসীম উচ্চ

আমরা মানুষ হিসেবে আমাদের ভালো কাজকে অন্য মানুষের ভাল কাজের সাথে তুলনা করি। "আমি তো চোর নই, খুনি নই, আমি তো ভালো মানুষ।" কিন্তু আল্লাহ আমাদের অন্য মানুষের সাথে তুলনা করেন না। তিনি আমাদের তাঁর নিজের পবিত্রতার মানদণ্ডে বিচার করেন।

"তোমরা পবিত্র হও, কারণ আমি তোমাদের আল্লাহ মাবুদ পবিত্র।"
(তাওরাত শরীফ, লেবীয় ১৯:২ আয়াত)

আল্লাহর পবিত্রতা (কুদ্দুসিয়্যাত) কতটা উচ্চ? ইশাইয়া নবী যখন আল্লাহর দর্শন পেয়েছিলেন, তখন ফেরেশতারা চিৎকার করে বলছিলেন:

"কুদ্দুস, কুদ্দুস, কুদ্দুস! বাহিনীগণের মাবুদ কুদ্দুস! সমস্ত দুনিয়া তাঁর জালালে পূর্ণ!"
(নবীদের কিতাব (যিশাইয়), ইশাইয়া ৬:৩ আয়াত)

আর ইশাইয়া নবী নিজে সেই দর্শন দেখে কী বলেছিলেন?

"হায়, আমি ধ্বংস হয়ে গেলাম, কারণ আমার মুখ নাপাক এবং আমি এমন লোকদের মধ্যে বাস করি যাদের মুখ নাপাক। আমি নিজের চোখে বাদশাহ্‌কে, আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীনকে দেখেছি!"
(নবীদের কিতাব (যিশাইয়), ইশাইয়া ৬:৫ আয়াত)

ইশাইয়া নবী আল্লাহর একজন মহান নবী ছিলেন। তবুও আল্লাহর পবিত্রতার সামনে তিনি নিজেকে "নাপাক" বলে স্বীকার করলেন। যদি একজন নবীও আল্লাহর পবিত্রতার মানদণ্ডে দাঁড়াতে না পারেন, তাহলে আমরা সাধারণ মানুষ কীভাবে আমাদের আমল দিয়ে সেই মানদণ্ডে পৌঁছাব?

খ. কারণ আমাদের সবচেয়ে ভালো কাজও আল্লাহর কাছে যথেষ্ট নয়

ইশাইয়া নবী আরও একটি কঠিন সত্য বলেছেন:

"আমরা প্রত্যেকে নাপাক লোকের মত হয়েছি আর আমাদের সব সৎ কাজ নোংরা কাপড়ের মত।"
(নবীদের কিতাব (যিশাইয়), ইশাইয়া ৬৪:৬ আয়াত)

"আমাদের সমস্ত সৎ বা ন্যায়ের কাজ নোংরা কাপড়ের মতো" এটি একটি কঠিন কথা, কিন্তু এর গভীরতা বুঝতে হবে।

একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝাই। ধরুন, আপনি একটি সাদা কাপড় পরে আছেন। কাপড়টিতে একটি ছোট্ট কালো দাগ পড়ে গেছে। আপনি সেই দাগটি ঢাকার জন্য কাপড়ের বাকি অংশে সুন্দর সুন্দর ফুলের ছবি আঁকলেন। কিন্তু দাগটি কি মুছে গেছে? নিশ্চয়ই না। দাগটি ফুলের নিচে লুকিয়ে আছে।

ঠিক তেমনি, আমাদের ভালো কাজগুলো (নামাজ, রোজা, দান-খয়রাত) সুন্দর ফুলের মতো। কিন্তু আমাদের ভেতরের গুনাহর দাগ (মিথ্যা, হিংসা, রাগ, অহংকার, লোভ) এই ভালো কাজ দিয়ে মুছে যায় না। আমরা বাইরে থেকে সুন্দর হতে পারি, কিন্তু ভেতরে সেই দাগ থেকেই যায়।

ঈসা মসীহ এই সত্যটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছিলেন:

"ধিক তোমাদের, ভণ্ড শরীয়তের আলেম ও ফরীশীরা! তোমরা পেয়ালা ও বাটির বাইরেটা পরিষ্কার করো, কিন্তু ভেতরে লোভ ও অসংযমে ভরা। হে অন্ধ ফরীশীরা! আগে পেয়ালার ভেতরটা পরিষ্কার করো, তাহলে বাইরেটাও পরিষ্কার হবে।"
(ইঞ্জিল শরীফ, মথি ২৩:২৫-২৬ আয়াত)

"তোমরা চুনকাম করা কবরের মতো। বাইরে থেকে সুন্দর দেখায়, কিন্তু ভেতরে মরা মানুষের হাড় ও সব রকমের ময়লায় ভরা।"
(ইঞ্জিল শরীফ, মথি ২৩:২৭ আয়াত)

ঈসা মসীহ বলছেন, সমস্যাটি বাইরে নয়, সমস্যাটি ভেতরে। বাইরের আমল দিয়ে ভেতরের গুনাহ দূর করা যায় না। আমাদের দরকার ভেতরের পরিবর্তন, যা শুধুমাত্র আল্লাহর পক্ষেই সম্ভব।

গ. কারণ শরীয়তের (আইনের) কাজ দিয়ে কেউ ধার্মিক হতে পারে না

পৌল অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন:

"শরীয়ত পালন করলেই যে আল্লাহ্‌ মানুষকে ধার্মিক বলে গ্রহণ করবেন তা নয়, কিন্তু শরীয়তের মধ্য দিয়েই মানুষ নিজের গুনাহের বিষয়ে চেতনা লাভ করে।"
(ইঞ্জিল শরীফ, রোমীয় ৩:২০ আয়াত)

শরীয়ত (আইন) কী করে? শরীয়ত আমাদের দেখিয়ে দেয় আমরা কোথায় ভুল করছি, ঠিক যেমন একটি আয়না আমাদের মুখের ময়লা দেখায়। কিন্তু আয়না কি ময়লা পরিষ্কার করতে পারে? অবশ্যই না। আয়না শুধু দেখায়, পরিষ্কার করার জন্য আলাদা কিছু দরকার।

ঠিক তেমনি, শরীয়ত আমাদের গুনাহ দেখায়, কিন্তু গুনাহ থেকে মুক্তি দেয় না। মুক্তির জন্য দরকার আল্লাহর অনুগ্রহ (Grace)।

ঘ. কারণ একটি মাত্র গুনাহও যথেষ্ট

"যে লোক সমস্ত শরীয়ত পালন করেও মাত্র একটা বিষয়ে গুনাহ্‌ করে সে সমস্ত শরীয়ত অমান্য করেছে বলতে হবে।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যাকোব), ইয়াকুব ২:১০ আয়াত)

একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বুঝিয়ে বলি। ধরুন, একটি কাচের জানালা আছে। আপনি সেই জানালায় একটি ছোট্ট ঢিল ছুড়লেন। পুরো কাচটি ভেঙে গেল। এখন কেউ বলবে না, "কাচের বেশিরভাগ অংশ তো ভাঙেনি, শুধু একটু ভেঙেছে।" না। কাচ ভাঙা মানে ভাঙা। একটু ভাঙা আর পুরোটা ভাঙা, ফলাফল একই: কাচটি আর অক্ষত নেই।

ঠিক তেমনি, আল্লাহর শরীয়তের একটি মাত্র বিধান ভাঙলেও আমরা "গুনাহগার" হয়ে যাই। আমরা হয়তো খুন করিনি, কিন্তু মিথ্যা বলেছি। হয়তো চুরি করিনি, কিন্তু হিংসা করেছি। হয়তো ব্যভিচার করিনি, কিন্তু মনে মনে লোভ করেছি। একটি মাত্র গুনাহই আমাদের আল্লাহর পবিত্রতার মানদণ্ড থেকে নামিয়ে দেয়।

দ্বিতীয়ত: কুরআন শরীফও কি মানুষের অক্ষমতা স্বীকার করে?

এখন আমরা দেখব কুরআন শরীফ মানুষের গুনাহ ও দুর্বলতা সম্পর্কে কী বলে। আশ্চর্যজনকভাবে, কুরআনের অনেক আয়াত কিতাবুল মোকাদ্দস-এর শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ক. মানুষ দুর্বল:

"আল্লাহ তোমাদের বোঝা হালকা করতে চান, কারণ মানুষকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে।"
(সূরা আন-নিসা, ৪:২৮ আয়াত)

খ. মানুষ অন্যায়কারী:

"নিশ্চয়ই মানুষ বড়ই অন্যায়কারী, অকৃতজ্ঞ।"
(সূরা ইব্রাহিম, ১৪:৩৪ আয়াত)

গ. মানুষ তার নিজের ক্ষতি করে:

"সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে।"
(সূরা আল-আসর, ১০৩:১-২ আয়াত)

ঘ. কেউই নিজেকে পবিত্র দাবি করতে পারে না:

"তাই তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি করো না। তিনিই (আল্লাহ) ভালো জানেন কে তাকওয়াশীল।"
(সূরা আন-নাজম, ৫৩:৩২ আয়াত)

কুরআন নিজেই স্বীকার করছে যে মানুষ দুর্বল, অন্যায়কারী, ক্ষতির মধ্যে আছে এবং কেউই নিজেকে পবিত্র দাবি করতে পারে না। তাহলে এই দুর্বল, অন্যায়কারী মানুষ কীভাবে তার নিজের আমল দিয়ে পবিত্র আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে?

তৃতীয়ত: তাহলে নাজাত কীভাবে আসে? কিতাবুল মোকাদ্দসের উত্তর

কিতাবুল মোকাদ্দস একটি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং সুনির্দিষ্ট উত্তর দেয়: নাজাত মানুষের আমলের ফল নয়, নাজাত আল্লাহর অনুগ্রহের (Grace) দান।

ক. নাজাত আল্লাহর দান, আমলের পুরস্কার নয়

"আল্লাহ্‌র রহমতে ঈমানের (অনুগ্রহেই) মধ্য দিয়ে তোমরা নাজাত পেয়েছ। এটা তোমাদের নিজেদের দ্বারা হয় নি, এটা আল্লাহ্‌রই দান। এটা কাজের ফল হিসাবে দেওয়া হয় নি, যেন কেউ গর্ব করতে না পারে।”
(ইঞ্জিল শরীফ, ইফিষীয় ২:৮-৯ আয়াত)

এই আয়াতটি কিতাবুল মোকাদ্দসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়াতগুলোর একটি। এখানে চারটি সত্য একসাথে প্রকাশিত:

১. নাজাত "রহমতে" (অনুগ্রহে/Grace): এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একতরফা দান। মানুষ এটি অর্জন করেনি।
২. "ঈমানের মাধ্যমে": মানুষের কাজ হলো শুধু বিশ্বাস করা, গ্রহণ করা। যেমন একজন ডুবন্ত মানুষের কাজ শুধু উদ্ধারকারীর হাত ধরা, সাঁতার কাটা নয়।
৩. "তোমাদের নিজেদের থেকে নয়": নাজাত মানুষের কৃতিত্ব নয়।
৪. "কাজের ফল নয়, যেন কেউ গর্ব করতে না পারে": যদি নাজাত আমলের ফল হতো, তাহলে মানুষ বলতো "আমি নিজে নিজেকে বাঁচিয়েছি।" কিন্তু নাজাত আল্লাহর দান, তাই সমস্ত কৃতিত্ব ও প্রশংসা আল্লাহর।

খ. আল্লাহ নিজেই নাজাতের পথ তৈরি করেছেন

"কারণ আল্লাহ দুনিয়াকে এতই মহব্বত করলেন যে তিনি তাঁর একমাত্র পুত্রকে দান করলেন, যেন যে কেউ তাঁর ওপর ঈমান আনে সে বিনষ্ট না হয়, বরং অনন্ত জীবন পায়।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ৩:১৬ আয়াত)

এটি সম্ভবত পুরো কিতাবুল মোকাদ্দসের সবচেয়ে বিখ্যাত আয়াত। এখানে নাজাতের সম্পূর্ণ চিত্র এক বাক্যে দেওয়া হয়েছে:

"আল্লাহ দুনিয়াকে মহব্বত করলেন" (কারণ: আল্লাহর ভালোবাসা)
"তাঁর একমাত্র পুত্রকে দান করলেন" (উপায়: ঈসা মসীহর কুরবানি)
"যে কেউ তাঁর ওপর ঈমান আনে" (শর্ত: ঈমান, আমল নয়)
"সে বিনষ্ট না হয়, বরং অনন্ত জীবন পায়" (ফলাফল: চিরকালের জীবন)

গ. গুনাহের বেতন বনাম আল্লাহর দান

"কারণ গুনাহের বেতন হলো মৃত্যু, কিন্তু আল্লাহর দান হলো আমাদের মাবুদ ঈসা মসীহের মধ্য দিয়ে অনন্ত জীবন।"
(ইঞ্জিল শরীফ, রোমীয় ৬:২৩ আয়াত)

এখানে দুটি শব্দ লক্ষ্য করুন: "বেতন" এবং "দান"বেতন হলো যা আপনি কাজ করে অর্জন করেন। আমরা গুনাহ করে মৃত্যু অর্জন করেছি। কিন্তু অনন্ত জীবন হলো একটি "দান"। দান কাজ করে অর্জন করা হয় না, দান গ্রহণ করা হয়। আল্লাহ আমাদের ঈসা মসীহর মাধ্যমে অনন্ত জীবনের দান দিচ্ছেন। আমাদের কাজ শুধু সেই দান গ্রহণ করা।

চতুর্থত: ঈসা মসীহ নিজে নাজাত সম্পর্কে কী বলেছেন?

ঈসা মসীহ নাজাত সম্পর্কে অত্যন্ত স্পষ্ট ও সরাসরি শিক্ষা দিয়েছেন। আসুন তাঁর নিজের কথাগুলো শুনি:

ক. "আমিই পথ"

"আমিই পথ, সত্য ও জীবন। আমার মধ্য দিয়ে না গেলে কেউ পিতার (আল্লাহর) কাছে যেতে পারে না।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ১৪:৬ আয়াত)

আমরা আমাদের আর্টিকেল "ঈসা মসীহ কি শুধুই একজন নবী ছিলেন, নাকি তিনি তার চেয়েও বেশি কিছু?" তে এই আয়াতটি বিস্তারিত দেখেছি। ঈসা মসীহ বলেননি "আমি একটি পথ দেখাই" বা "আমি অনেক পথের মধ্যে একটি"। তিনি বললেন "আমিই পথ"। একমাত্র পথ।

খ. "আমিই দরজা"

"আমিই দরজা। আমার মধ্য দিয়ে কেউ ঢুকলে সে রক্ষা পাবে। সে ঢুকবে ও বের হবে এবং চারণভূমি পাবে।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ১০:৯ আয়াত)

আমরা আমাদের আর্টিকেল "তাওরাত শরীফে মসীহের ছায়া" তে দেখেছি কীভাবে নূহের নৌকা ছিল মুক্তির একমাত্র দরজার প্রতীক। ঈসা মসীহ নিজেই সেই দরজা।

গ. "যে ঈমান আনে সে বিচারিত হয় না"

"কারণ আল্লাহ তাঁর পুত্রকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন দুনিয়ার বিচার করতে নয়, বরং তাঁর মাধ্যমে দুনিয়াকে নাজাত দিতে। যে তাঁর ওপর ঈমান আনে তাকে বিচার করা হয় না।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ৩:১৭-১৮ আয়াত)

"যে ঈমান আনে তাকে বিচার করা হয় না।" এটি নাজাতের সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা। যে ঈসা মসীহর ওপর ঈমান আনে, তাকে আর বিচারের সম্মুখীন হতে হবে না। কেন? কারণ ঈসা মসীহ ইতিমধ্যেই তার বদলে সেই বিচারের শাস্তি ভোগ করেছেন। আমরা আমাদের আর্টিকেল "ক্রুশীয় মৃত্যু ও ঐতিহাসিক প্রমাণ: পরাজয় নাকি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিজয়?" তে দেখেছি কীভাবে ক্রুশে ঈসা মসীহ আমাদের গুনাহর সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করেছেন।

ঘ. "আমি তাদের অনন্ত জীবন দিই"

"আমি তাদের অনন্ত জীবন দিই, তারা কখনো ধ্বংস হবে না এবং কেউ তাদের আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না। আমার পিতা (আল্লাহ) যিনি তাদের আমাকে দিয়েছেন, তিনি সবার চেয়ে মহান এবং কেউ তাদের আমার পিতার হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ১০:২৮-২৯ আয়াত)

"তারা কখনো ধ্বংস হবে না" এবং "কেউ তাদের আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না।" এটি নাজাতের চূড়ান্ত নিশ্চয়তা। আমলভিত্তিক ধার্মিকতায় এই নিশ্চয়তা কখনো পাওয়া যায় না। কারণ আমল ওঠানামা করে, আমরা কখনো ভালো থাকি, কখনো খারাপ। কিন্তু ঈসা মসীহর হাত থেকে কেউ আমাদের ছিনিয়ে নিতে পারবে না, কারণ নাজাত আমাদের আমলের ওপর নির্ভরশীল নয়, এটি আল্লাহর অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল।

পঞ্চমত: আমলের স্থান কোথায়?

এখন কেউ হয়তো প্রশ্ন করবেন, "যদি নাজাত আমলের ফল না হয়, তাহলে কি আমরা যা ইচ্ছা তা-ই করব?"

এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং কিতাবুল মোকাদ্দস এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দেয়:

"আমরা আল্লাহ্‌র হাতের তৈরী। আল্লাহ্‌ মসীহ্‌ ঈসার সংগে যুক্ত করে আমাদের নতুন করে সৃষ্টি করেছেন যাতে আমরা সৎ কাজ করি। এই সৎ কাজ তিনি আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন, যেন আমরা তা করে জীবন কাটাই।"
(ইঞ্জিল শরীফ, ইফিষীয় ২:১০ আয়াত)

এখানে লক্ষ্য করুন, এই আয়াতটি ইফিষীয় ২:৮-৯ (নাজাত অনুগ্রহে, আমলে নয়) এর ঠিক পরেই আসছে। অর্থাৎ:

আয়াত ৮-৯: নাজাত আমলের ফল নয়, এটি আল্লাহরই দান।
আয়াত ১০: কিন্তু নাজাত পাওয়ার পর আমরা ভালো কাজের জন্য সৃষ্ট।

পার্থক্যটি বুঝুন: ভালো কাজ নাজাতের "কারণ" নয়, ভালো কাজ নাজাতের "ফল"।

একটি সহজ উদাহরণ: একটি আপেল গাছ ফল দেয় কারণ সে আপেল গাছ। সে ফল দিয়ে আপেল গাছ হয়ে ওঠে না। ঠিক তেমনি, একজন মানুষ ভালো কাজ করে কারণ সে নাজাত পেয়েছে এবং তার হৃদয় পরিবর্তন হয়েছে। সে ভালো কাজ করে নাজাত পায় না।

ষষ্ঠত: ইব্রাহিম নবীর উদাহরণ, ঈমান নাকি আমল?

কিতাবুল মোকাদ্দস ইব্রাহিম নবীকে "ঈমানের পিতা" বলে। কিন্তু ইব্রাহিম নবী কীভাবে আল্লাহর সামনে ধার্মিক সাব্যস্ত হয়েছিলেন? আমল দিয়ে? নাকি ঈমান দিয়ে?

"ইব্রাহিম মাবুদের কথার উপর ঈমান আনলেন আর মাবুদ সেইজন্য তাঁকে ধার্মিক বলে গ্রহণ করলেন।"
(তাওরাত শরীফ (আদিপুস্তক), পয়দায়েশ ১৫:৬ আয়াত)

লক্ষ্য করুন, ইব্রাহিম নবী কোনো আমল করেননি। তিনি শুধু "আল্লাহকে বিশ্বাস করলেন"। আর আল্লাহ সেই বিশ্বাসকেই "ধার্মিকতা" বলে গণ্য করলেন। ইব্রাহিম নবী তখনও খৎনা করেননি, তখনও তাওরাত পাননি, তখনও কোনো শরীয়ত পালন করেননি। তিনি শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করেছিলেন। আর এটিই ছিল যথেষ্ট।

পৌল এই বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে বলেছেন:

"যদি ইব্রাহিম কাজের দ্বারা ধার্মিক সাব্যস্ত হতেন, তাহলে তাঁর গর্ব করার কারণ থাকতো, কিন্তু আল্লাহ্‌র সামনে তাঁর গর্ব করবার কিছুই নেই। কারণ কিতাব কী বলে? 'ইব্রাহিম আল্লাহ্‌র কথার উপর ঈমান আনলেন আর সেইজন্যই আল্লাহ্‌ তাঁকে ধার্মিক বলে গ্রহণ করলেন।' কাজ করে যে বেতন পাওয়া যায় তা দান নয়, পাওনা। কিন্তু যে নিজের চেষ্টার উপর ভরসা না করে কেবল আল্লাহ্‌র উপর ঈমান আনে আল্লাহ্‌ তার সেই ঈমানের জন্য তাকে ধার্মিক বলে ধরেন, কারণ তিনিই গুনাহ্‌গারকে ধার্মিক বলে গ্রহণ করতে পারেন।"
(ইঞ্জিল শরীফ, রোমীয় ৪:২-৫ আয়াত)

তাহলে মূল সারাংশ কি দাঁড়ায়? পথ আছে দুটি, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে হবে একটির

প্রিয় পাঠক, আজকে আমরা দুটি পথ দেখেছি:

পথ ১: আমলের পথ
এই পথে আপনাকে নিজের চেষ্টায়, নিজের ভালো কাজে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো:

  • আপনি জানেন না আপনার আমল যথেষ্ট কি না।

  • আপনি জানেন না আল্লাহ আপনাকে মাফ করবেন কি না।

  • আপনার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

  • কুরআন নিজেই বলছে মানুষ দুর্বল, অন্যায়কারী এবং ক্ষতির মধ্যে আছে।

  • কিতাবুল মোকাদ্দস বলছে আমাদের সমস্ত ন্যায়ের কাজ নোংরা কাপড়ের মতো।

পথ ২: অনুগ্রহের পথ (Grace)
এই পথে আল্লাহ নিজেই আপনার নাজাতের ব্যবস্থা করেছেন ঈসা মসীহর কুরবানির মাধ্যমে। আপনার কাজ শুধু ঈসা মসীহতে ঈমান আনা।

  • আপনার নাজাত নিশ্চিত, কারণ এটি আল্লাহর দান।

  • আপনাকে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে না, কারণ ঈসা মসীহ আপনার বদলে বিচার ভোগ করেছেন।

  • কেউ আপনাকে আল্লাহর হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না।


পথ ১: মানুষের চেষ্টার ওপর নির্ভরশীল, যেখানে ব্যর্থতার সম্ভাবনা সবসময় থাকে। পথ ২: আল্লাহর ক্ষমতা ও ভালোবাসার ওপর নির্ভরশীল, যেখানে ব্যর্থতার কোনো সম্ভাবনা নেই। আপনি কোন পথ বেছে নেবেন?

ঈসা মসীহ আপনাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন:

"তোমরা যারা ক্লান্ত ও বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছ, তোমরা সবাই আমার কাছে এস; আমি তোমাদের বিশ্রাম দেব।"
(ইঞ্জিল শরীফ, মথি ১১:২৮ আয়াত)

আপনি কি ক্লান্ত? আপনি কি নিজের আমলের বোঝা বহন করতে করতে ক্লান্ত? আপনি কি "যথেষ্ট ভালো" হওয়ার চেষ্টা করতে করতে ক্লান্ত? ঈসা মসীহ বলছেন, "আমার কাছে এসো, আমি তোমাকে বিশ্রাম দেব।"

পরবর্তী আর্টিকেলে আমরা দেখব "তাহরীফ" (বিকৃতি) তত্ত্বের ঐতিহাসিক ভিত্তি আসলে কতটুকু এবং কুরআনের আয়াতগুলো আসলে কী বলে।

পড়ুন: "তাহরীফ (বিকৃতি) তত্ত্বের ঐতিহাসিক মূল্যায়ন: প্রথম শতাব্দীর দলিল ও পরবর্তী ধারণার বিশ্লেষণ"।

আপনার জন্য একটি প্রশ্ন

আপনি যদি আজ রাতে আল্লাহর সামনে দাঁড়ান এবং তিনি জিজ্ঞেস করেন, "তোমাকে কেন জান্নাতে দেওয়া উচিত?"

আপনি কি সাথে সাথেই আল্লাহকে আপনার আমলের তালিকা দেখাবেন? কিন্তু আপনার গুনাহর তালিকা কি তার চেয়ে ছোট?

নাকি আপনি বলবেন, "হে আল্লাহ, আমি জানি আমার আমল যথেষ্ট নয়। কিন্তু তোমার কালিমাতুল্লাহ, ঈসা মসীহ, আমার গুনাহর কাফফারা দিয়েছেন। আমি তাঁর ওপর ঈমান এনেছি। আমি তোমার অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করছি।"

"কারণ গুনাহের বেতন হলো মৃত্যু, কিন্তু আল্লাহর দান হলো আমাদের মাবুদ ঈসা মসীহের মধ্য দিয়ে অনন্ত জীবন।"
(ইঞ্জিল শরীফ, রোমীয় ৬:২৩ আয়াত)

প্রিয় পাঠক, আমাদের লেখাগুলো পড়ার সময় আপনার মনে অনেক কিছু নিয়ে সংশয় বা প্রশ্নের উদয় হতে পারে, তাই যদি আপনার ক্ষেত্রেও এমনটি হয়, তবে আর দেরি না করে এখনই আমাদেরকে তা লিখে জানাতে পারেন; আমরা অবশ্যই আপনাকে যথাযথ সহযোগীতা করবো, ইনশাল্লাহ্।

আপনার মনের অনুভুতি পাঠান

আপনার পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আমরা কোনো বিতর্ক ছাড়াই অত্যন্ত সম্মানের সাথে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর প্রদান করি।

আমি কিতাবুল মোকাদ্দস পড়তে চাই, কিভাবে পেতে পারি?