পৌলের শিক্ষা বনাম মসীহের শিক্ষা:

পৌল কি ঈসা মসীহের ধর্ম বদলে দিয়েছিলেন?

এই একটি অভিযোগ যা শত শত বছর ধরে চলে আসছে

প্রিয় পাঠক, আপনি হয়তো শুনেছেন বা পড়েছেন যে, "খ্রীষ্টধর্মের আসল প্রতিষ্ঠাতা হলেন পৌল (Paul), ঈসা মসীহ নন।" এই দাবিটি অনেক মুসলিম পণ্ডিত, কিছু পশ্চিমা সমালোচক এবং এমনকি কিছু নাস্তিক গবেষকও মনে করে থাকেন, এমন কি এদের কেউ কেউ আছেন, যারা এটিকে বিশ্বাসও করেন। কারন, তাঁদের প্রায় সকলেরই মূল অভিযোগগুলো হলো:

  • "পৌল ঈসা মসীহকে কখনো দেখেননি, তিনি নিজে নিজে একটি নতুন ধর্ম তৈরি করেছেন।"

  • "পৌল ঈসা মসীহের সাধারণ শিক্ষাকে বদলে দিয়ে তাঁকে আল্লাহর পুত্র বানিয়ে দিয়েছেন।"

  • "আসল ঈসা মসীহ শুধু একজন ইহুদি নবী ছিলেন, পৌল তাঁকে ঈশ্বর বানিয়ে দিয়েছেন।"

  • "পৌলের শিক্ষা এবং ঈসা মসীহর শিক্ষা সম্পূর্ণ ভিন্ন।"

এই অভিযোগগুলো শুনতে মুখরোচক ও শক্তিশালী মনে হতে পারে। কিন্তু আজকে আমরা ঐতিহাসিক দলিল, কিতাবুল মোকাদ্দসের আয়াত এবং যুক্তির আলোকে প্রতিটি অভিযোগ পরীক্ষা করব।

আমি আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, এই লেখাটি পড়ার শেষে আপনি নিজেই বিচার করতে পারবেন পৌল কি সত্যিই ঈসা মসীহর শিক্ষা বদলে দিয়েছিলেন, নাকি তিনি ঠিক সেই সত্যই প্রচার করেছিলেন যা ঈসা মসীহ শিখিয়ে গিয়েছিলেন।

প্রথমত: পৌল কে ছিলেন? প্রথমে তাঁর পটভূমি জানা জরুরি

পৌলকে বোঝার আগে তাঁর জীবনের পটভূমি জানা অত্যন্ত জরুরি। কারণ তাঁর জীবনকাহিনী নিজেই একটি শক্তিশালী প্রমাণ।

ক. পৌল ছিলেন ঈসা মসীহর কট্টর শত্রু

পৌলের আসল নাম ছিল শৌল (Saul)। তিনি ছিলেন একজন গোঁড়া ফরীশী (Pharisee), অর্থাৎ ইহুদি শরীয়তের কঠোর অনুসারী। তিনি বিখ্যাত ইহুদি রাব্বি গামালিয়েলের (Gamaliel) ছাত্র ছিলেন, যিনি সেই সময়ের সবচেয়ে সম্মানিত শরীয়ত শিক্ষকদের একজন ছিলেন।

পৌল নিজে তাঁর অতীত সম্পর্কে লিখেছেন:

"আট দিনের দিন আমাকে খৎনা করানো হয়েছিল; ইসরাইল জাতির মধ্যে বিন্‌ইয়ামীনের বংশে আমার জন্ম; আমি একজন খাঁটি ইবরানী; মূসার শরীয়ত পালনের ব্যাপারে আমি একজন ফরীশী; ধর্মের ব্যাপারে আমি এমন গোঁড়া ছিলাম যে, মসীহের জামাতের উপর আমি জুলুম করতাম; আর আল্লাহ্‌র গ্রহণযোগা্য হবার আশায় মূসার শরীয়ত পালনের ব্যাপারে কেউ আমার নিন্দা করতে পারত না।"

(ইঞ্জিল শরীফ, ফিলিপীয় ৩:৫-৬ আয়াত)

তিনি শুধু নিষ্ক্রিয় বিরোধী ছিলেন না, তিনি সক্রিয়ভাবে ঈসা মসীহের অনুসারীদের গ্রেপ্তার, কারাবন্দী এবং হত্যা করতেন:

"শৌল সেই জামাতকে ধ্বংস করবার চেষ্টায় ঘরে ঘরে গিয়ে সেই জামাতের পুরুষ ও স্ত্রীলোকদের টেনে এনে জেলে দিতে লাগলেন।"

(ইঞ্জিল শরীফ, প্রেরিত ৮:৩ আয়াত)

"শৌল ঈসা মসীহের উম্মতদের হত্যা করবেন বলে ভয় দেখাচ্ছিলেন। দামেস্ক শহরের মজলিস-খানাগুলোতে দেবার জন্য তিনি মহা-ইমামের কাছে গিয়ে চিঠি চাইলেন। যত লোক ঈসার পথে চলে, তারা পুরুষ হোক বা স্ত্রীলোক হোক, তাদের পেলে যেন তাদের বেঁধে জেরুজালেমে আনতে পারেন সেই ক্ষমতার জন্যই তিনি সেই চিঠি চেয়েছিলেন।"

(ইঞ্জিল শরীফ, প্রেরিত ৯:১-২ আয়াত)

এখানে একটু থামুন এবং ভাবুন। একজন মানুষ যিনি ঈসা মসীহর অনুসারীদের গ্রেপ্তার ও হত্যা করতেন, যিনি ছিলেন ঈসা মসীহর সবচেয়ে কট্টর শত্রু, তিনি কেন হঠাৎ ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে ঈসা মসীহর সবচেয়ে বড় প্রচারক হয়ে গেলেন? কোন শক্তি তাঁকে পরিবর্তন করলো?

খ. দামেস্কের পথে পৌলের জীবন পরিবর্তনকারী অভিজ্ঞতা

"তিনি যখন দামেস্কের কাছাকাছি আসলেন, তখন আসমান থেকে হঠাৎ তাঁর চারদিকে আলো পড়ল। তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন এবং শুনলেন, কে যেন তাঁকে বলছেন, “শৌল, শৌল, কেন তুমি আমার উপর জুলুম করছ?” শৌল জিজ্ঞাসা করলেন, “প্রভু, আপনি কে?” তিনি বললেন, “আমি ঈসা, যাঁর উপর তুমি জুলুম করছ।“

(ইঞ্জিল শরীফ, প্রেরিত ৯:৩-৫ আয়াত)

পুনরুত্থিত ঈসা মসীহ নিজেই পৌলকে দেখা দিলেন। এই অভিজ্ঞতা পৌলের জীবন চিরতরে বদলে দিলো। তিনি অন্ধ হয়ে গেলেন এবং তিন দিন পর আল্লাহর নির্দেশে অননিয় নামে একজন ঈমানদার এসে তাঁর চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিলেন। পৌল পানিতে তরিকাবন্দী নিলেন এবং ঈসা মসীহের প্রচারক হয়ে গেলেন।

এখন প্রশ্ন হলো: একজন মানুষ যিনি ক্ষমতাবান ছিলেন, সম্মানিত ছিলেন, ধর্মীয় নেতৃত্বের পথে ছিলেন, তিনি কেন সবকিছু ছেড়ে দিয়ে এমন একটি বিশ্বাস গ্রহণ করলেন যা তাঁকে কারাবন্দী, নির্যাতিত ও শেষ পর্যন্ত শহীদ করে দিলো? কোনো সুস্থ বুদ্ধির মানুষ কি ক্ষমতা, সম্মান ও নিরাপত্তা ছেড়ে দিয়ে কারাগার, চাবুক ও মৃত্যু বেছে নেবে, শুধুমাত্র একটি মিথ্যা বা নিজের বানানো ধর্মের জন্য?

দ্বিতীয়ত: পৌল কি ঈসা মসীহের শিক্ষা বদলে দিয়েছিলেন? আসুন তুলনা করি

এখন আসি মূল প্রশ্নে। পৌলের শিক্ষা কি ঈসা মসীহর শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক ছিল? আসুন প্রতিটি বিষয়ের তুলনা করি।

ক. ঈসা মসীহ কি আল্লাহর পুত্র? ঈসা মসীহ নিজে কী বলেছেন বনাম পৌল কী বলেছেন

ঈসা মসীহ নিজে বলেছেন:

"আমি ও পিতা (আল্লাহ) এক।"

(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ১০:৩০ আয়াত)

"যে আমাকে দেখেছে সে পিতাকে (আল্লাহকে) দেখেছে।"

(ইঞ্জিল শরীফ (ইউহোন্না), ইউহোন্না ১৪:৯ আয়াত)

"ইব্রাহিমের জন্মের আগে থেকেই আমি আছি (I AM)।"

(ইঞ্জিল শরীফ (ইউহোন্না), ইউহোন্না ৮:৫৮ আয়াত)

পৌল বলেছেন:

"তিনি (ঈসা মসীহ) অদৃশ্য আল্লাহর প্রতিমূর্তি, সমস্ত সৃষ্টির প্রথমজাত। কারণ তাঁরই মধ্য দিয়ে আসমান ও জমিনের সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে।"

(ইঞ্জিল শরীফ, কলসীয় ১:১৫-১৬ আয়াত)

ঈসা মসীহ নিজেই বলেছেন "আমি ও পিতা এক" এবং "আমি আছি (I AM)"। আমরা আমাদের আর্টিকেল "ঈসা মসীহ কি শুধুই একজন নবী ছিলেন, নাকি তিনি তার চেয়েও বেশি কিছু?" তে বিস্তারিত দেখেছি যে ঈসা মসীহ নিজেই ঐশ্বরিক দাবি করেছিলেন। পৌল নতুন কিছু তৈরি করেননি, তিনি ঈসা মসীহ নিজে যা বলেছিলেন তা-ই প্রচার করেছেন।

খ. ক্রুশীয় মৃত্যু ও কুরবানি: ঈসা মসীহ নিজে কী বলেছেন বনাম পৌল কী বলেছেন

ঈসা মসীহ নিজে বলেছেন:

"মনে রেখো, ইবনুল আদম সেবা পেতে আসেন নি বরং সেবা করতে এসেছেন এবং অনেক লোকের মুক্তির মূল্য হিসাবে তাদের প্রাণের পরিবর্তে নিজের প্রাণ দিতে এসেছেন।”

(ইঞ্জিল শরীফ, মার্ক ১০:৪৫ আয়াত)

"এ আমার রক্ত যা অনেকের গুনাহের ক্ষমার জন্য দেওয়া হবে। মানুষের জন্য আল্লাহ্‌র নতুন ব্যবস্থা আমার এই রক্তের দ্বারাই বহাল করা হবে।"

(ইঞ্জিল শরীফ, মথি ২৬:২৮ আয়াত)

পৌল বলেছেন:

"পাক-কিতাবের কথামতই মসীহ্‌ আমাদের গুনাহের জন্য মরেছিলেন।"

(ইঞ্জিল শরীফ, ১ করিন্থীয় ১৫:৩ আয়াত)

ঈসা মসীহ নিজেই বলেছেন তিনি "মুক্তিপণ হিসেবে প্রাণ দিতে" এসেছেন এবং তাঁর রক্ত "গুনাহের ক্ষমার জন্য ঢালা হচ্ছে।" আমরা আমাদের আর্টিকেল "ক্রুশীয় মৃত্যু ও ঐতিহাসিক প্রমাণ" তে দেখেছি যে ক্রুশীয় মৃত্যু ঈসা মসীহর নিজের পরিকল্পনার অংশ ছিল। পৌল এটি বানাননি, ঈসা মসীহ নিজেই এটি শিখিয়েছেন।

গ. ঈমানের মাধ্যমে নাজাত: ঈসা মসীহ নিজে কী বলেছেন বনাম পৌল কী বলেছেন

ঈসা মসীহ নিজে বলেছেন:

“আল্লাহ্‌ মানুষকে এত মহব্বত করলেন যে, তাঁর একমাত্র পুুত্রকে তিনি দান করলেন, যেন যে কেউ সেই পুত্রের উপর ঈমান আনে সে বিনষ্ট না হয় কিন্তু অনন্ত জীবন পায়।“

(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ৩:১৬ আয়াত)

"যে আমার ওপর ঈমান আনে তাকে বিচার করা হয় না।"

(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ৩:১৮ আয়াত)

পৌল বলেছেন:

"কারণ তোমরা রহমতেই (অনুগ্রহেই) ঈমানের মাধ্যমে নাজাত পেয়েছ। এটা তোমাদের নিজেদের থেকে নয়, এটা আল্লাহর দান। এটা কাজের ফল নয়, যেন কেউ গর্ব করতে না পারে।"

(ইঞ্জিল শরীফ, ইফিষীয় ২:৮-৯ আয়াত)

ঈসা মসীহ বলেছেন "যে ঈমান আনে সে অনন্ত জীবন পায়।" পৌল বলেছেন "ঈমানের মাধ্যমে নাজাত।" দুজনের শিক্ষা হুবহু একই! আমরা আমাদের আর্টিকেল "নাজাতের ধারণা" তে এই বিষয়ে বিস্তারিত দেখেছি।

ঘ. পুনরুত্থান: ঈসা মসীহ নিজে কী বলেছেন বনাম পৌল কী বলেছেন

ঈসা মসীহ নিজে বলেছেন:

"আমিই পুনরুত্থান ও জীবন। যে আমার ওপর ঈমান আনে সে মরে গেলেও জীবিত হবে।"

(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ১১:২৫ আয়াত)

পৌল বলেছেন:

"মসীহ যদি জীবিত হয়ে না উঠে থাকেন, তাহলে আমাদের প্রচার বৃথা এবং তোমাদের ঈমানও বৃথা।"

(ইঞ্জিল শরীফ, ১ করিন্থীয় ১৫:১৪ আয়াত)

ঈসা মসীহ বলেছেন তিনি "পুনরুত্থান ও জীবন"। পৌল বলেছেন পুনরুত্থানই পুরো বিশ্বাসের ভিত্তি। দুজনের শিক্ষা একই। আমরা আমাদের আর্টিকেল "পুনরুত্থান: মৃত্যু কি ঈসা মসীহকে ধরে রাখতে পেরেছিল?" তে দেখেছি যে পুনরুত্থান ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। পৌল এটি বানাননি, তিনি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা প্রচার করেছেন।

তৃতীয়ত: পৌলের আগে অন্যান্য সাহাবীরা কি একই শিক্ষা দিতেন?

এটি সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ। যদি পৌল নতুন কিছু তৈরি করে থাকেন, তাহলে ঈসা মসীহর মূল সাহাবীরা (পিতর, ইয়াকুব, ইউহোন্না) তাঁর বিরোধিতা করতেন। কিন্তু তাঁরা কি করেছিলেন?

ক. পিতরের শিক্ষা (পৌলের আগে)

পিতর পঞ্চাশত্তমী-ঈদের দিনে (পেন্টেকোস্ট), পৌলের ধর্মান্তরের অনেক আগে, প্রচার করেছিলেন:

"তোমরা এই ঈসাকে ক্রুশে দিয়ে হত্যা করেছ। কিন্তু আল্লাহ মৃত্যুর যন্ত্রণা থেকে তাঁকে মুক্ত করে জীবিত করেছেন, কারণ মৃত্যুর পক্ষে তাঁকে ধরে রাখা সম্ভব ছিল না।"
(ইঞ্জিল শরীফ, প্রেরিত ২:২৩-২৪ আয়াত)

"তাই ইসরাইলের সমস্ত লোক নিশ্চিতভাবে জানুক যে, এই ঈসাকেই আল্লাহ মাবুদ ও মসীহ উভয়ই করেছেন, যাঁকে তোমরা ক্রুশে দিয়েছিলে।"
(ইঞ্জিল শরীফ, প্রেরিত ২:৩৬ আয়াত)

পিতর, ঈসা মসীহর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সাহাবী, পৌলের আগেই ঈসা মসীহর ক্রুশীয় মৃত্যু, পুনরুত্থান এবং তাঁর "মাবুদ ও মসীহ" হওয়ার কথা প্রচার করেছিলেন। পৌল এসে নতুন কিছু যোগ করেননি।

খ. ইয়াকুব (ঈসা মসীহর ভাই) এর সাক্ষ্য

ইয়াকুব ছিলেন ঈসা মসীহের নিজের ভাই। তিনি প্রথমে ঈসা মসীহতে বিশ্বাস করতেন না (ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ৭:৫ আয়াত)। কিন্তু পুনরুত্থানের পর তিনি বিশ্বাস করলেন এবং জেরুজালেম জামাতের নেতা হলেন।

পৌল লিখেছেন:

"তারপর তিনি (পুনরুত্থিত ঈসা মসীহ) ইয়াকুবকে দেখা দিলেন।"
(ইঞ্জিল শরীফ, ১ করিন্থীয় ১৫:৭ আয়াত)

ইয়াকুব নিজে তাঁর পত্রে লিখেছেন:

"আমি আল্লাহর ও মাবুদ ঈসা মসীহের দাস ইয়াকুব।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যাকোব), ইয়াকুব ১:১ আয়াত)

ঈসা মসীহর নিজের ভাই তাঁকে "মাবুদ" (Lord) বলে সম্বোধন করছেন! যদি পৌল মিথ্যা শিক্ষা দিতেন, তাহলে ঈসা মসীহের নিজের পরিবারের সদস্যরা কি তা মেনে নিতেন?

গ. ইউহোন্না (ঈসা মসীহর প্রিয় সাহাবী) এর শিক্ষা

ইউহোন্না ছিলেন ঈসা মসীহর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সাহাবীদের একজন। তিনি লিখেছেন:

"শুরুতে কালাম ছিলেন, সেই কালাম আল্লাহর সাথে ছিলেন এবং সেই কালাম নিজেই খোদা ছিলেন।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ১:১ আয়াত)

"তিনি শুধুমাত্র আমাদের গুনাহের জন্য নয়, বরং সমস্ত দুনিয়ার গুনাগার লোকদের গুনাহ্ দুর করার জন্য কাফফারা হলেন।"
(ইঞ্জিল শরীফ, ১ ইউহোন্না ২:২ আয়াত)

ইউহোন্না, যিনি ঈসা মসীহর সাথে তিন বছর ঘুরেছেন, তাঁর শিক্ষা শুনেছেন, তাঁর মোজেজা দেখেছেন, তিনিও ঠিক সেই একই শিক্ষা দিচ্ছেন যা পৌল দিচ্ছেন: ঈসা মসীহ হলেন আল্লাহর কালাম এবং তিনি আমাদের গুনাহের কাফফারা। পৌল নতুন কিছু তৈরি করেননি, সমস্ত সাহাবীরাই একই শিক্ষা দিয়েছেন।

চতুর্থত: পৌল কি অন্য সাহাবীদের কাছ থেকে অনুমোদন পেয়েছিলেন?

কেউ হয়তো বলবেন, "হতে পারে পৌল নিজে নিজে প্রচার করেছেন এবং অন্য সাহাবীরা জানতোও না।" কিন্তু এটি সত্য নয়।

"চৌদ্দ বছর পর আমি আবার জেরুজালেমে গেলাম... আমি তাঁদের (সাহাবীদের) কাছে সেই সুসংবাদ উপস্থাপন করলাম যা আমি অইহুদিদের মধ্যে তবলিগ করি... যারা নেতা বলে গণ্য ছিলেন (ইয়াকুব, কৈফা/পিতর ও ইউহোন্না) তাঁরা আমাকে ও বার্নাবাসকে সহভাগিতার ডান হাত বাড়িয় দিলেন।"
(ইঞ্জিল শরীফ, গালাতীয় ২:১-৯ আয়াত)

পৌল জেরুজালেমে গিয়ে মূল সাহাবীদের (ইয়াকুব, পিতর ও ইউহোন্না) সামনে তাঁর শিক্ষা উপস্থাপন করেছিলেন। তাঁরা পৌলের শিক্ষা শুনে "সহভাগিতার ডান হাত" দিয়েছিলেন, অর্থাৎ তাঁরা পৌলের শিক্ষা অনুমোদন করেছিলেন এবং একমত হয়েছিলেন।

যদি পৌল ঈসা মসীহর শিক্ষা বদলে দিয়ে থাকতেন, তাহলে পিতর, ইয়াকুব ও ইউহোন্না কি তাঁকে অনুমোদন দিতেন? তাঁরা তো ঈসা মসীহর সাথে তিন বছর কাটিয়েছেন! তাঁরা জানতেন ঈসা মসীহ কী শিখিয়েছেন। যদি পৌলের শিক্ষা ঈসা মসীহের শিক্ষা থেকে ভিন্ন হতো, তাঁরা তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করতেন।

পিতর নিজেই পৌলের লেখাকে "কিতাবের অংশ" বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন:

"এই একই কথা আমাদের প্রিয় ভাই পৌলও আল্লাহ্‌র দেওয়া জ্ঞানে তোমাদের কাছে লিখেছেন। তাঁর সব চিঠিতেই তিনি এই সব বিষয় সম্বন্ধে এই একই কথা লিখে থাকেন। সেগুলোর মধ্যে অবশ্য কতগুলো বিষয় আছে যা বোঝা কঠিন। সেইজন্য যারা উম্মত হবার শিক্ষা পায় নি ও যাদের মন অস্থির তারা অন্যান্য কিতাবের মত এগুলোর মানেও ঘুরিয়ে বলে নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনে।"
(ইঞ্জিল শরীফ, ২ পিতর ৩:১৫-১৬ আয়াত)

পিতর পৌলকে "প্রিয় ভাই" বলেছেন এবং পৌলের পত্রগুলোকে "অন্যান্য কিতাবের" সাথে তুলনা করেছেন। অর্থাৎ পিতর নিজে পৌলের লেখাকে কিতাবের সমতুল্য মনে করতেন।

পঞ্চমত: পৌলের দুঃখভোগ, একজন জালিয়াত কি এত কষ্ট সহ্য করবে?

পৌল তাঁর জীবনে কী কী সহ্য করেছিলেন? তিনি নিজে লিখেছেন:

"আমি ইহুদীদের হাতে পাঁচ বার ঊনচল্লিশ আঘাত চাবুক খেয়েছি, বেত দিয়ে তিন বার আমাকে মারা হয়েছে। এক বার আমাকে পাথর মারা হয়েছিল। তিন বার আমার জাহাজ-ডুবি হয়েছিল। একদিন ও একরাত আমি সমুদ্রের পানির মধ্যে ছিলাম। আমি অনেক দেশ ঘুরেছি। বন্যা, ডাকাত, নিজের জাতির লোক এবং অ-ইহুদীদের দরুন আমি বিপদে পড়েছি। তা ছাড়া শহরে, মরুভূমিতে, সমুদ্রে এবং ভণ্ড ভাইদের মধ্যেও আমি বিপদে পড়েছি। মসীহের সেবা করতে গিয়ে আমি কষ্টের মধ্যেও কঠিন পরিশ্রম করেছি। আমি অনেক রাত জেগেছি, খিদে ও পিপাসায় কষ্ট পেয়েছি, না খেয়ে থেকেছি, ঠাণ্ডায় ও কাপড়-চোপড়ের অভাবে কষ্ট পেয়েছি। বাইরের এই সব ব্যাপার ছাড়াও সব জামাতগুলোর জন্য রোজই আমার উপর চিন্তার চাপ পড়ছে।“
(ইঞ্জিল শরীফ, ২ করিন্থীয় ১১:২৪-২৮ আয়াত)

এবং শেষ পর্যন্ত ঐতিহ্য অনুসারে পৌলকে রোমে সম্রাট নিরোর (Nero) শাসনামলে (আনুমানিক ৬৪-৬৭ খ্রীষ্টাব্দ) শিরশ্ছেদ করে হত্যা করা হয়।

এখন নিজেকে প্রশ্ন করুন: একজন মানুষ যিনি ক্ষমতাবান ফরীশী ছিলেন, ধর্মীয় নেতৃত্বের পথে ছিলেন, সম্মান ও নিরাপত্তায় ছিলেন, তিনি কেন সবকিছু ছেড়ে দিয়ে চাবুক, কারাগার, জাহাজডুবি, ক্ষুধা ও শেষ পর্যন্ত শিরশ্ছেদ বেছে নেবেন? শুধুমাত্র একটি মিথ্যা বা নিজের বানানো ধর্মের জন্য?

মানুষ মিথ্যার জন্য বাঁচতে পারে, কিন্তু মিথ্যার জন্য মরে না। পৌল যদি জানতেন যে তাঁর শিক্ষা মিথ্যা বা বানানো, তিনি কখনো এত কষ্ট সহ্য করতেন না। তিনি মরেছেন কারণ তিনি জানতেন তিনি সত্য বলছেন। তিনি পুনরুত্থিত ঈসা মসীহকে নিজের চোখে দেখেছিলেন।

ষষ্ঠত: ঐতিহাসিক প্রমাণ, পৌলের আগেও একই বিশ্বাস ছিল

পণ্ডিতরা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চিহ্নিত করেছেন। পৌল তাঁর চিঠিগুলোতে কিছু প্রাচীন "ক্রিড" বা "বিশ্বাসের সারসংক্ষেপ" উদ্ধৃত করেছেন যা পৌলের নিজের তৈরি নয়, বরং তাঁর আগে থেকেই খ্রীষ্টীয় জামাতগুলোতে প্রচলিত ছিল।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ:

"কারণ আমি সবার আগে তোমাদের কাছে সেটাই পৌঁছে দিয়েছি যা আমি নিজেও পেয়েছিলাম: মসীহ কিতাব অনুযায়ী আমাদের গুনাহের জন্য মরলেন, তাঁকে দাফন করা হলো এবং কিতাব অনুযায়ী তৃতীয় দিনে তিনি জীবিত হয়ে উঠলেন, তিনি কৈফাকে (পিতরকে) দেখা দিলেন, তারপর সেই বারোজনকে।"
(ইঞ্জিল শরীফ, ১ করিন্থীয় ১৫:৩-৫ আয়াত)

পৌল স্পষ্টভাবে বলছেন: "আমি নিজেও পেয়েছিলাম" (I received) অর্থাৎ এই শিক্ষা পৌলের নিজের তৈরি নয়, তিনি এটি আগে থেকেই প্রচলিত ঐতিহ্য থেকে পেয়েছেন।

প্রখ্যাত নিউ টেস্টামেন্ট পণ্ডিত Gary Habermas (Liberty University) তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে এই "ক্রিড" (১ করিন্থীয় ১৫:৩-৫) ঈসা মসীহর ক্রুশবিদ্ধকরণের মাত্র ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে গঠিত হয়েছিল, অর্থাৎ পৌলের ধর্মান্তরেরও আগে! (Gary Habermas, "The Historical Jesus: Ancient Evidence for the Life of Christ", College Press, 1996, পৃষ্ঠা ১৫৩-১৫৫)।

পৌল ধর্মান্তরিত হওয়ার আগেই খ্রীষ্টীয় মণ্ডলীতে ঈসা মসীহর মৃত্যু, দাফন, পুনরুত্থান ও প্রকাশিত হওয়ার বিশ্বাস প্রচলিত ছিল। পৌল এটি বানাননি, তিনি আগে থেকে প্রচলিত বিশ্বাসই গ্রহণ ও প্রচার করেছেন।

সপ্তমত: একটি যৌক্তিক সারসংক্ষেপ

আসুন, পুরো আলোচনাটি যৌক্তিকভাবে সারসংক্ষেপ করি:

যদি পৌল ঈসা মসীহর শিক্ষা বদলে দিয়ে থাকেন, তাহলে:

১. ঈসা মসীহর নিজের সাহাবীরা (পিতর, ইয়াকুব, ইউহোন্না) কেন পৌলের শিক্ষা অনুমোদন করলেন?
২. ঈসা মসীহর নিজের ভাই ইয়াকুব কেন পৌলের সাথে একমত হলেন?
৩. পিতর কেন পৌলের লেখাকে "কিতাবের" সমতুল্য বললেন?
৪. পৌলের ধর্মান্তরের আগেই কেন একই বিশ্বাস প্রচলিত ছিল?
৫. ঈসা মসীহ নিজে কেন ঠিক সেই কথাই বলেছেন যা পৌল প্রচার করেছেন?
৬. পৌল কেন একটি মিথ্যার জন্য ক্ষমতা, সম্মান ও নিরাপত্তা ছেড়ে দিয়ে চাবুক, কারাগার ও মৃত্যু বেছে নেবেন?

এই প্রশ্নগুলোর কোনো সন্তোষজনক উত্তর নেই যদি আমরা ধরে নিই পৌল মিথ্যাবাদী বা জালিয়াত ছিলেন। একমাত্র যৌক্তিক উত্তর হলো: পৌল সত্য বলেছিলেন। তিনি পুনরুত্থিত ঈসা মসীহকে সত্যিই দেখেছিলেন এবং তিনি ঠিক সেই সত্যই প্রচার করেছিলেন যা ঈসা মসীহ নিজে শিখিয়েছিলেন এবং অন্য সাহাবীরাও প্রচার করেছিলেন।

সুতরাং, পৌল নতুন কিছু তৈরি করেননি

প্রিয় পাঠক, আজকে আমরা দেখলাম:

প্রথমত, পৌল ছিলেন ঈসা মসীহর সবচেয়ে কট্টর শত্রু। তাঁর ধর্মান্তর নিজেই একটি শক্তিশালী প্রমাণ।

দ্বিতীয়ত, পৌলের শিক্ষা এবং ঈসা মসীহর নিজের শিক্ষা বিষয়ে বিষয়ে তুলনা করলে দেখা যায় দুটি হুবহু একই।

তৃতীয়ত, ঈসা মসীহর মূল সাহাবীরা (পিতর, ইয়াকুব, ইউহোন্না) পৌলের শিক্ষা অনুমোদন করেছিলেন।

চতুর্থত, পৌলের ধর্মান্তরের আগেই একই বিশ্বাস প্রচলিত ছিল।

পঞ্চমত, পৌলের দুঃখভোগ ও শাহাদাত প্রমাণ করে তিনি সত্য বলছিলেন।

"পৌল ঈসা মসীহের ধর্ম বদলে দিয়েছেন" এই দাবিটি ঐতিহাসিক ও যৌক্তিক প্রমাণের আলোকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। পৌল নতুন কিছু তৈরি করেননি। তিনি ঠিক সেই সত্যই প্রচার করেছেন যা ঈসা মসীহ শিখিয়ে গিয়েছিলেন, যা অন্য সাহাবীরাও প্রচার করেছিলেন এবং যা আদি খ্রীষ্টীয় মণ্ডলী শুরু থেকেই বিশ্বাস করতো।

পরবর্তী আর্টিকেলে আমরা দেখব খ্রীষ্টীয় বিশ্বাসে কি নামাজ, রোজা, দান ও ইবাদত আছে? নাকি খ্রীষ্টানরা শুধু "বিশ্বাস করো আর যা ইচ্ছা তাই করো" এই নীতিতে চলেন?

এখনই পড়ুন: "খ্রীষ্টীয় বিশ্বাস, ইবাদত ও আমল সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা"

আপনার জন্য একটি প্রশ্ন

আপনি কি এখনো বিশ্বাস করেন যে পৌল ঈসা মসীহের শিক্ষা বদলে দিয়েছিলেন?

যদি পৌল মিথ্যাবাদী হতেন, তাহলে:

  • ঈসা মসীহের নিজের ভাই কেন তাঁর সাথে একমত হয়েছেন?

  • ঈসা মসীহের নিজের সাহাবীরা কেন তাঁকে অনুমোদন দিয়েছেন?

  • তিনি কেন ক্ষমতা ও সম্মান ছেড়ে দিয়ে চাবুক, কারাগার ও মৃত্যু বেছে নিয়েছিলেন?

ঈসা মসীহ নিজেই বলেছিলেন:

"আর তোমরা সত্যকে জানবে এবং সেই সত্যই তোমাদের মুক্ত করবে।"
(ইঞ্জিল শরীফ (যোহন), ইউহোন্না ৮:৩২ আয়াত)

সত্য জানুন। সত্য আপনাকে মুক্ত করবে।

প্রিয় পাঠক, আমাদের লেখাগুলো পড়ার সময় আপনার মনে অনেক কিছু নিয়ে সংশয় বা প্রশ্নের উদয় হতে পারে, তাই যদি আপনার ক্ষেত্রেও এমনটি হয়, তবে আর দেরি না করে এখনই আমাদেরকে তা লিখে জানাতে পারেন; আমরা অবশ্যই আপনাকে যথাযথ সহযোগীতা করবো, ইনশাল্লাহ্।

আপনার মনের অনুভুতি পাঠান

আপনার পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আমরা কোনো বিতর্ক ছাড়াই অত্যন্ত সম্মানের সাথে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর প্রদান করি।

আমি কিতাবুল মোকাদ্দস পড়তে চাই, কিভাবে পেতে পারি?